তাসফিয়া হত্যা: সামাজিক অবক্ষয় ও অস্থিরতা

7c861a14-d0cc-4140-92ed-3bbf177ca9a6

যেকোনো মৃত্যুই বেদনাদায়ক, কষ্টকর। স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক যেভাবেই হোক না কেন, মৃত্যু মানেই বেদনা, কান্না ও একগাদা হতাশা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, আমাদের দেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার ক্রমশ বাড়ছে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা।

অনেক আগের কথা বাদ দিলেও আমাদের সময়ে যে সামাজিক বন্ধন ছিল, এখন তার সিকি ভাগও নেই। পরিবারের বড়জনকে আমরা যেভাবে শ্রদ্ধা করতাম, তার ছিটেফোঁটাও এখন দেখা যায় না। একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সে তো বহু দূরের কথা। ব্যতিক্রম যে একেবারে নেই, তা নয়। সেটি খুবই নগণ্য।

পতেঙ্গা সমুদ সৈকত থেকে কিশোরীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় সামাজিক অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতার রূপ ব্যাপকভাবে ফুটে উঠেছে। ২ মে, বুধবার সকাল ৯টার দিকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকার ১৮ নম্বর ব্রিজের উত্তর পাশ থেকে অজ্ঞাত এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তার পরিচয় জানা যায়। সে নগরীর সানশাইন গ্রামার স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্রী তাসফিয়া আমিন (১৬)।

ওই ছাত্রীর লাশ উদ্ধারের পর কথিত প্রেমিক আদনান মির্জাকে আটক করে পুলিশ। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কর্ণফুলী জোনের সহকারী কমিশনার জাহেদুল ইসলাম জানান, তাসফিয়ার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তার প্রেমিক আদনানকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আটক করা হয়েছে। তবে তাসফিয়ার সাথে সম্পর্কের কথা স্বীকার করলেও হত্যার কথা অস্বীকার করেছে আদনান। তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই চলছে।

এর আগে ২০১৬ সালের প্রথম দিকে রাজধানীসহ সারা দেশে শিশু হত্যা ও অপহরণের মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। রাজধানীতে ভাই ও বোনকে বাসার ভেতর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের পর শিশুটির পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছিলেন, চায়নিজ রেস্তোরাঁর খাবার খেয়ে শিশু দুটি মারা গেছে। কিন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে এবং শিশুদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

রাজধানীতে রহস্যজনকভাবে ওই দুই শিশু হত্যা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনার এক দিন আগে কুমিল্লায় সৎ ভাইয়ের হাতে মারা যায় আরও দুই শিশু। শুধু কুমিল্লা জেলাতেই চার দিনে চার শিশুকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে একটি শিশুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয়।

হবিগঞ্জের বাহুবলে একসাথে চার শিশুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। শিশু অধিকার ফোরাম নামে একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে, ২০১৬ সালের দুই মাসে মারা গেছে ৪৯ জন শিশু। গত বছর মারা গেছে ২৯২ জন। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৬৬ জন।

নির্মম এসব হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগ রহস্য অজানা থেকে যাচ্ছে। যেমন বাহুবল ও রাজধানীর কেরানীগঞ্জে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। ফলে এসব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানা যায়নি।

আমরা মনে করি, শিশু হত্যার এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি সমাজে নির্মমতার কারণগুলো অনুসন্ধান করা দরকার। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা যাবে না। একইভাবে মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সবাইকে জেগে উঠতে হবে।

আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশনগুলোতে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি কিছু সামাজিক বিজ্ঞাপনও প্রচারিত হতো। এ ধরনের একটি বিজ্ঞাপন সে দেশের স্যালভেশন আর্মি দ্বারা স্পন্সরড ছিল। একটি বিজ্ঞাপণের বিষয় ছিল হৃদয়গ্রাহী। মধ্যরাতে এক কিশোরকে একটি বিলাসবহুল গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হতো। সাথে সাথে পেছনে একটি কণ্ঠস্বর বলে উঠত, ‘আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) বিশ্বের সবচেয়ে অতৃপ্ত জাতি। নিজেদের ব্যবহৃত দ্রব্যাদি ডাস্টবিনে যেমন ফেলি।’

আমাদেরও সচেতনতা বাড়ানো দরকার। সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া সমাজে অমানবিকতা রুখে দেওয়া অসম্ভব।

Check Also

মাস্ক পরলেই ঝাপসা হচ্ছে চশমার গ্লাস, যা করবেন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে মাস্ক ব্যবহার করা আমাদের প্রতিদিনের রুটিন। তবে মাস্ক পরলে উপকারের সঙ্গে সঙ্গে …