ছেলের মৃত্যুর পর ওরা আমার বাসায় ওষুধ ছিটাতে এসেছিল!

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া রাইয়ান সরকারের (১১) ছোট্ট বোন মালিহা সরকার (৬) ডেঙ্গুর সাথে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত সুস্থতার পথে জানালেন অসহায় বাবা মমিন সরকার। এসময় কান্না জড়িত কণ্ঠে মমিন সরকার বলেন, আমার বাগানের দুটি লাল গোলাপের একটি চলে গেছে। কত যত্ন করেই না তাদের লালন-পালন করেছি।

এসময় তিনি আরও বলেন, আমার মত হতাভাগা বাবা যেন কারও না হতে হয়। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল- আমার ছেলের মৃত্যুর পর সিটি করপোরেশন থেকে আমার বাসায় ওষুধ ছিটাতে এসেছিল।

সম্প্রতি দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশো অনুষ্ঠানে তিনি এ সব কথা বলেন।

রাইয়ান রাজধানীর মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। শুক্রবার (২ আগস্ট) দুপুরে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

রাইয়ানের বাবা মমিন সরকার টেলিভিশনের টকশো অনুষ্ঠানে টেলিসংযোগে যুক্ত হয়ে বলেন, ২৮ জুলাই ওর (রাইয়ান) প্রচণ্ড জ্বর হয়। আমি সঙ্গে সঙ্গে ওকে সাপোজিটরি দেই কিন্তু জ্বর কমে না। আবারও সাপোজিটর দেই কিন্তু জ্বরের তীব্রতা বরং ১০২ থেকে ১০৪ গিয়ে ওঠে। অবশেষে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার রাইয়ানকে দেখে রক্তসহ বেশ কিছু পরীক্ষা দেয়। আমি ওর রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট একদিন পরে পাই। পরীক্ষায় ধরা পড়ে ওর ডেঙ্গু হয়েছে। একদিন পরে রিপোর্টটি না পেয়ে যদি সঙ্গে সঙ্গে বা কিছু সময়ের মাঝে পেতাম, তবে আমার ছেলের হয়তো বা এমন করুন মৃত্যু হতো না। সে যাই হোক। আমি কি বলব। বলার মত অবস্থা আমার নেই। তবে একটি কথা না বললেই নয়, আমি ছেলেকে নিয়ে এ হাসপাতাল ও হাসপাতাল দৌঁড়িয়েছি। কোথাও সিট খালি পাইনি। যে হাসপাতালেই গেছি, কোথাও সিট পাইনি। আইসিডিডিআরবি যদি আপনারা দেখতে যান বুঝতে পারবেন? ডেঙ্গুতে মহামারি আকার ধারণ করেছে। কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। তাবু টাঙ্গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবশেষে রাইয়ানকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করি। ক্রমেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রক্ত দেয়া হয় এবং লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। গতকাল (২ আগস্ট) দুপুর দেড়টার দিকে আমার ছেলেটা মারা যায়। এরপরেই চিৎকার করে কাঁদেন রাইয়ানের বাবা।

রাইয়ানের বাবা বলেন, ছেলেটা যে আমার এভাবে চলে যাবে তা বিশ্বাস হয়নি। অথচ রক্তে প্লাটিলেট যখন কমে যাওয়ার খবর দেয় ডাক্তাররা। তখনও আমার বিশ্বাস ছিল রাইয়ান আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে চলে গেল। আমার বাগানের দুটো লাল গোলাপের মাঝে একটি চলে গেল। অথচ আমি কিছুই করতে পারলাম না।

তিনি আরও বলেন, আমার মেয়ে মালিহা বলল আব্বু আমি ভাইয়ার কাছে যাব। আমি তাকে বলি-তুমি যাবে ভাইয়ার কাছে? মেয়ে বলে হ্যাঁ আব্বু যাব। তখন মেয়কে বলি- মা তুমি আর একটু সুস্থ হও তারপর তোমাকে নিয়ে যাব কিন্তু শেষ পর্যন্ত ও যখন জানবে তার প্রিয় ভাই পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে বহু দূরে চলে গেছ। তখন কি উত্তর দিব ছোট্ট মালিহাকে?

এ সময় উপস্থাপক ফারজানা রুপা ক্ষমা চেয়ে বলেন, এই শোক সইবার শক্তি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপনাকে দিক। তবে আপনি যেখানে থাকেন, সেখানে কি মশার ওষুধ ছিটানো দেখেছেন? এর জবাবে তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরের শেখেরটেকে আমার বাসা। আমার ছেলে মারা যাওয়ার পর দেখেছি ওষুধ ছিটানোর জন্য লোক এসেছে। এর আগে ওভাবে খুব একটা দেখিনি। তবে আমি চাই, যেকোন ঘটনা ঘটার পূর্বে যদি ব্যবস্থা নেওয়া হয় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমবে। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন যদি আরও যত্নবান হতো তবে এই মহামারি থেকে নগরবাসী বেঁচে যেত। আমি সন্তান হারা হতাম না।

Check Also

পেঁয়াজের বিকল্প এখন চিভ!

পেঁয়াজ ও রসুনের স্বাদ বা গুণাগুণ থাকায় আপৎকালীন সময়ে এর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে ‘চিভ’- …