Advertisements

১৭ দিনেও খোঁজ মেলেনি কিশোরী আনানের

anan ১৭ দিনেও খোঁজ মেলেনি কিশোরী আনানের

রাঙামাটি শহরের ফরেস্ট কলোনীর বাসা থেকে গত ৮ সেপ্টেম্বর হ্যাপির মোড়ের সাগর স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যায় দেলোয়ার হোসেন ও উর্মিলা আলম দম্পতির বড় মেয়ে আজরা আতিকা আনান (১৬)। লেকার্স পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এ বছরই এসএসসি পাশ করে ঢাকার লালমাটিয়া মহিলা কলেজে ভর্তি হওয়া আনান ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ায় আর কলেজে যায়নি।

সরকারের জন্মনিবন্ধন সনদ অনুসারে ২০০৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া আনান সেদিনই প্রথম প্রাইভেটে গিয়েছিল। কিন্তু প্রাইভেট থেকে নির্ধারিত সময়ে বাসায় ফিরে না আসায় তার বাবা-মা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন প্রাইভেট পড়তে যায়নি আনান। বরং ওইদিন রাঙামাটি নিউ মার্কেটের সামনে থেকে একটি প্রাইভেটকারে করে আনানকে তুলে নিয়ে যায় শহরের কাঠালতলি এলাকার নেসার আহমেদের ছেলে নিয়াদ খান ও তার বন্ধু আরমান।

অপহরণকারীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আনানের পরিবার। নিয়াদের পরিবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মেয়েকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে ওইদিনই আইনি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকে আনানের পরিবার। কিন্তু দুইদিন পরও মেয়েকে এনে দিতে না পারায় ১০ সেপ্টেম্বর কোতয়ালি থানায় অপহরণকারী নিয়াদ, তার বাবা, মা ও বোনদের আসামি করে মামলা করে আনানের বাবা দেলোয়ার হোসেন।

পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়াদের বাবা নেসার আহমেদকে। আদালতের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয় জেলহাজতে। এই মামলার অন্য আসামি নিয়াদের মা রেহানা বেগম, বোন লাভলী ও কলিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর হঠাৎ রাঙামাটির সাংবাদিকদের ইমেইলে একটি ছবিসহ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আসে। সেই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ওইদিন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে আনান-নিয়াদ। সেখানে তারা নিজেদের প্রাপ্তবয়স্ক দাবি করে নিজেরা বিয়ে করেছে বলে জানায় এবং বিয়ের স্বীকৃতি দাবি করে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে দেওয়া ছবিতে দেখা যায়, আনান লিখিত বক্তব্য পাঠ করছে এবং তার দুই পাশে নিয়াদ খান ও তার মামা লিয়াকত আলী খান।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আনান সাংবাদিকদের নিজের জন্মসনদও সরবরাহ করেছে (যা পরে ভুয়া ও তার মায়ের বিয়ের আগের বলেও প্রমাণিত হয়েছে) এবং বিয়ের বৈধতা দাবি করেছে। সে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি পাঠানো হয়েছে তাতে প্রেরক হিসেবে ঠিকানা আছে ‘আব্দুল মালেক খান, স্বত্বাধিকারী, এম খান প্রিন্টার্স, জিএ ভবন, আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রাম, ফোন-০১৮২০৫৪৭১৮০। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই আব্দুল মালেক খান অপহরণকারী নিয়াদ খানের আরেক মামা।

অপহরণের ১৪ দিন পরও নিজেদের মেয়েকে ফিরে না পাওয়ায় উৎকণ্ঠিত আনানের বাবা-মা ২২ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি শহরের একটি রেস্টুরেন্টে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। তারা সেখানে দাবি করেন, ‘আমরা বাবা-মা হিসেবে আমাদের মেয়েকে ফেরত পেতে চাই। আমার অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে নিয়ে যে নোংরা রাজনীতি করা হচ্ছে আমরা তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং দ্রুত আমাদের মেয়েকে সুস্থ শরীরে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার মিনতি জানাচ্ছি আপনাদের মাধ্যমে। আমরা আপনাদের মাধ্যমে, রাঙামাটির সকল প্রশাসন ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে করজোরে মিনতি করছি এক অসহায় পিতামাতাকে দুর্বিসহ জীবনযাপন থেকে উদ্ধার করে একটি পরিবারকে বাঁচাতে, আমাদের মেয়েকে উদ্ধার করতে। একই সঙ্গে অপহরণকারী নিয়াদ খান, আরমানসহ তাদের সহযোগীরা, তাদের বাবা-মা, বোন ও মামা লিয়াকত আলী খান, আব্দুল মালেক খান ও আব্দুল খালেককে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’

তৎপর পুলিশ-পিবিআই, তবুও মিলছে না হদিস
আনানের অপহরণ ঘটনার পর থেকেই সক্রিয় রাঙামাটি জেলা পুলিশ। রাঙামাটি কোতয়ালি থানা পুলিশ আনানকে উদ্ধারে সম্ভাব্য সবখানেই অভিযান চালিয়েছে এবং ক্রমাগত চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অফিসার ইনচার্জ জাহিদ হোসেন রনি ও ওসি তদন্ত খান নুরুল ইসলাম। এই দুই চৌকষ পুলিশ অফিসার জানিয়েছেন, ‘আমরা দফায় দফায় বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছি। ইতিমধ্যেই ছেলের বাবাকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছি। মামলার অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারেও অভিযান চলছে। শুধু আসামিদেরই নয়, এই ঘটনার সঙ্গে ন্যুনতম সম্পর্ক আছে, এমন কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করার বিষয়টি চরম অপরাধ বলেও মন্তব্য করেছেন এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। এদিকে মঙ্গলবার আনানের বাসায় গিয়ে তার মাকে শান্তনা জানিয়ে অবিলম্বে এই অপহরণ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও আনানকে উদ্ধার করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) ছুফিউল্লাহ। পুলিশের পাশাপাশি আনানকে উদ্ধারে কাজ করছে পিবিআইও। ইতিমধ্যেই অপহরণকারী নিয়াদের মামা ও আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দানকারী লিয়াকত আলী খানের বাসায় অভিযান চালিয়েছে তারা।

Advertisements

নোংরা রাজনীতির শিকার আনান?
এদিকে আনানের অপহরণ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বখাটে নিয়াদ খান ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির অনুসারী বলে জানিয়েছে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো। সভাপতি সুজনের বিরোধীতাকারী হিসেবে পরিচিত আনানের মামা রাশেদ ভিন্ন একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফলে আনানকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে জেলা ছাত্রলীগের সুজন অনুসারীরা নিয়াদকে উৎসাহ প্রদান ও নানাভাবে পরামর্শ, পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সুজন অনুসারীরা নিয়াদকে উৎসাহিত করে নানান পরামর্শ দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। প্রশাসনকেও নানাভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে সুজন অনুসারীদের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, কাঠালতলিকেন্দ্রিক একাধিক সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধিও রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে অপহরণকারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে! এনিয়ে চলছে সর্বত্র ব্যাপক সমালোচনা। এই প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের সহসভাপতি সাইফুল আলম রাশেদ বলেন, ‘তারা আমার সঙ্গে রাজনীতি করবে, করুক সেটা আমি রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করব। কিন্তু আমার ছোট্ট ভাগ্নিকে নিয়ে তারা যে কদর্য কুৎসিত রাজনীতি চর্চায় মেতে উঠেছে তা আমাদের দলের জন্যই লজ্জার। আমি বিষয়টি আমাদের সিনিয়র নেতাদেরকে অবহিত করেছি। তারা বিষয়টি দেখছেন।’

কে এই লিয়াকত আলী খান?
এদিকে আনাকে অপহরণের ৮ দিন পর ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে হঠাৎই দৃশ্যপটে হাজির হন লিয়াকত আলী খান নামের এক ব্যক্তি। মূলত: অপহরণকারী নিয়াদ খানের মামা এই লিয়াকত নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দিয়ে গণমাধ্যমকে ও প্রশাসনকে প্রভাবিত করার সব চেষ্টাই করে যাচ্ছেন। কিশোরী আনানকে বিয়ে পড়ানোতে প্রধান ভূমিকা রাখার পর ওইদিন সংবাদ সম্মেলনে সশরীরে হাজির হওয়া, সাংবাদিকদের কাছে আনানের এডিটিং করা মিথ্যা জন্ম সনদ সরবরাহ করা, মিথ্যা তথ্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি। সর্বশেষ গত ২৩ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে নিজের যে কম্পোজ করা প্যাড ব্যবহার করেছেন তিনি তাতে নিজের চারটি পরিচয় উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো- ‘১. সাবেক সভাপতি, চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগ, ২. সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, ৩. সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক, চট্টগ্রাম কলেজ প্রাক্তন ছাত্রলীগ পরিষদ এবং ৪. সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর।’

আওয়ামী লীগের কোনো ইউনিটের পরিচয় দিতে না পারলেও নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দিয়ে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগত প্যাডে পাঠানো বিবৃতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক বিয়েকে জায়েজ করা, অপহৃতার বাবা-মা সম্পর্কে কটুক্তি ও মানহানিকর কথা বলা এবং রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে ফোন করে ‘সমঝোতা’র প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি। আনানের বাবা-মা সংবাদ সম্মেলনে এই লিয়াকত আলী খান সম্পর্কে বলেছেন, ‘লিয়াকত আলী খান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং আসামি গ্রেপ্তার না করার জন্য নানাভাবে চাপ তৈরি করছে। সে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলেছে, আমাদের মেয়ে তার কাছে আছে, হ্যাডম থাকলে যেন কেউ উদ্ধার করে।’

তারা আরো বলেন, ‘নিয়াদ খানের মামা লিয়াকত আলী খান ও আব্দুল মালেক খান আমাদের ফোন করে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল, হুমকি এবং ‘পারলে কিছু করিস’ বলে দম্ভ প্রকাশ করে এবং লিয়াকত আলী খান আমার আপন ছোট ভাই সাইফুল আলম রাশেদকে ‘গুম করে ফেলা’র হুমকি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে তথাকথিত সমঝোতার জন্য হুমকি দিচ্ছে, অন্যথায় আমাদের পুরো পরিবারকে ‘জেলের ভাত খাওয়ানো এবং নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।’ জানা গেছে, তার বাসায় অভিযান চালানোর সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন লিয়াকত।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে লিয়াকত আলী খান বলেছেন, ‘কাউকে হুমকি আমি দেইনি, প্রশ্নই আসে না। আর বিয়ের ঘটনার সঙ্গেও আমি জড়িত নই। আমার বোনের পরিবার বিপদে পড়ায় আমি শুধুমাত্র পাশে দাঁড়িয়েছি। কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও আমি করিনি।’

তবে লিয়াকত আলী খানের বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে আনানের মামা ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল আলম রাশেদ বলেছেন, ‘এই লিয়াকত আলী খানই নাটের গুরু। তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলেই আমার ভাগ্নির খোঁজ পাওয়া যাবে। আমরা পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করছি এই মাস্টারমাইন্ডকে গ্রেপ্তার করতে।’

Advertisements

Check Also

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

মার্চে খুলতে পারে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় মার্চ মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত সরকার নিতে পারে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের …