একা আছিতো কী হয়েছে!

একা থাকার ধারণাটা আমাদের সমাজে নতুন হলেও অপরিচিত নয়। বিস্তারিত বলেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক (মনোরোগ) ড. মেখলা সরকার।

অনেকে ভেবেচিন্তেই বেছে নেন একাকী জীবন। প্রচলিত ভাষায় তাঁদের বলা হয় ‘কনফার্মড ব্যাচেলর’। অনেকে আবার বিয়েবিচ্ছেদের পর সিদ্ধান্ত নেন আর বিয়ে না করার। সিদ্ধান্তটা একেবারেই নিজস্ব হওয়া উচিত। আগে ভালোভাবে ভেবে নেওয়া জরুরি এর সুবিধা-অসুবিধাগুলোও। বিশেষ করে মেয়েদের বিবেচনা করা দরকার, তার যথেষ্ট আর্থিক সঙ্গতি আছে কিনা। শেষ বয়সে কোথায় থাকবেন। অন্যথায় তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

যেকোনো দাম্পত্যেই ত্যাগ স্বীকার করতে হয় দুজনকেই। প্রয়োজন-অপ্রয়োজন মেলাতে গিয়ে ছাড় দিতে হয় অনেক কিছুতে। আবার দুজনের সবকিছু পরস্পরের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে অনেক সময় বদলে ফেলতে হয় নিজেদের সহজাত বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব। ছাড় দিতে হয় মানসিকতায়। বিশেষ করে ব্যক্তিচিন্তার বাইরে সমাজের জন্য জীবনকে দেখার পরিসরে দুজনের মতৈক্য হওয়া জরুরি। একজনের চিন্তার ব্যাপারে আরেকজনকে হতে হবে সহানুভূতিশীল। না হলে একজনকে আরেকজনের কাছে নিজের আবেগ-অনুভূতি, অনেক সময় কাজও লুকাতে হয়। একাকী জীবনের বড় সুবিধা, এ ধরনের কোনো লুকোচুরির প্রয়োজন হয় না। এমনকি জীবনসঙ্গীর বাধায় পছন্দের কাজ করতে না পারার আফসোসেও পুড়তে হয় না। নিজের ইচ্ছামতো যাপন করা যায় জীবন।

তবে একাকী জীবনের অসুবিধাও রয়েছে। মানুষকে জীবনের প্রতিটি স্তরেই নানা সংকটের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। সেসব মোকাবেলায় দাম্পত্য সঙ্গীর সাহচর্য ভীষণ সহায়ক হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতেও সাহায্য করে সে। সঙ্গীর সঙ্গে গড়ে ওঠা ভালোবাসা ও স্নেহের সম্পর্ক সব সময় ইতিবাচক শক্তি জোগায়, যা মানুষকে ক্রমাগত এগিয়ে চলতে সাহায্য করে। তবে এটাও সত্যি, সব দাম্পত্যে এমন ভালোবাসা ও স্নেহের সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে। আবার গড়ে উঠলেও অনেক সময় অটুট থাকে না শেষ অবধি।

কেউ যদি সব দিক চিন্তা করে ইতিবাচক দিকগুলোর ওপর জোর দিয়ে একা থাকার সিদ্ধান্ত নেন, সেই সিদ্ধান্ত যে খারাপ তা বলার অবকাশ নেই। তবে একা থাকার ক্ষেত্রে মানসিক দিকটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি এমন হয়, কেউ একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু মনে রয়ে গেছে দ্বিধা, তাতে উল্টো ফল হতে পারে। কাজ করবে একাকিত্বের বোধ। আচ্ছন্ন করবে বিষণ্নতা। ফলে তার অনাকাঙ্ক্ষিত কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে। যেমন—একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া, অস্থিতিশীল সম্পর্ক গড়া, এমনকি মাদক গ্রহণও অসম্ভব নয়। তাই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন, তিনি আসলেই একা থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত কি না।

পাশাপাশি নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখাটাও ভীষণ জরুরি। নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি থাকতে হবে পূর্ণ আস্থা। আশপাশের মানুষ কী ভাবছে, কী বলছে, সেসব নিয়ে ভাবলে নিজের মধ্যে হীনম্মন্যতা কাজ করতে পারে। তৈরি হতে পারে সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখার প্রবণতা। অনেকেই বিচ্ছেদের তথ্য লুকিয়ে রাখতে চান। অর্থাত্ নিজের কাছেই তার এ অবস্থাটা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না। এই বোধ নিশ্চিতভাবেই তার মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে তার মধ্যে একধরনের আত্মবিশ্বাসহীনতা কাজ করে।

কেউ একা থাকতে পারবে কি না সেটা নির্ভর করে তাঁর মানসিকতার ওপর। তিনি ছেলে না মেয়ে, তার ওপর নয়। যিনি একা থাকছেন, সমাজের আর দশজনের চেয়ে তিনি এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। এই ভিন্নতা তিনি কতটা সহজভাবে গ্রহণ করতে পারবেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের ছেলে-মেয়েরা আত্মবিশ্বাসী হন। ফলে তাঁদের জন্য একাকী জীবনযাপন খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু দুর্বল বা নাজুক ব্যক্তিত্বের কারো জন্য এটা খুবই চ্যালেঞ্জিং।

সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রেই এমনটা বেশি হতে দেখা যায়। কারণ আমাদের সমাজে শিশুদের বেড়ে ওঠার যে প্রচলিত প্রক্রিয়া, তাতে ছেলেরা ছোটবেলা থেকেই সুযোগ-সুবিধা পায় বেশি। বাইরে খেলাধুলা করে বেশি, বন্ধুবান্ধবও বেশি থাকে। ছোটবেলা থেকেই অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ নেয় বলে তাদের চাপ মোকাবেলার ক্ষমতাও বেশি হয়। গড়ে ওঠে আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস। উল্টোটা ঘটে বলে সাধারণত মেয়েরা এসব ক্ষেত্রে খানিকটা পিছিয়ে থাকে। তবে মানসিক গঠনে পারিবারিক শিক্ষা, আবহ ও পরিবেশও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের ইতিবাচক প্রভাবে একজন মেয়েও মানসিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার আত্মবিশ্বাস হবে দৃঢ়, দৃষ্টিভঙ্গি হবে ইতিবাচক, সিদ্ধান্ত হবে স্পষ্ট। তার জন্য একা থাকাটা খুব কঠিন হবে না।

তবে একা থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সমাজে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অনেক বেশি জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হয়। অবশ্য ছেলেরা এ থেকে একেবারে মুক্ত থাকে তেমনটিও নয়। এটা আসলে নির্ভর করে একজন ছেলে বা মেয়ে বিষয়টি কিভাবে সামলাচ্ছেন তার ওপর। কেউ যদি এ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন, তাহলে তিনি এই সামাজিক চাপ সামলাতে পারবেন না। কেউ যখন এ নিয়ে তার দিকে আঙুল তুলবে, তিনি আরো বেশি কুণ্ঠিত হবেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ছেলেরাই বেশি সুবিধা পায়। নানা কারণে অনেক বেশি মানুষের সঙ্গে তাদের সংযোগ থাকে। ফলে সামাজিক চাপও তারা তুলনামূলক ভালো সামলাতে পারে।

কীর্তিমান হওয়ার ক্ষেত্রে একাকী জীবনযাপন সহায়ক হতে পারে। তবে তা অনেক বেশি নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। মানুষের অগ্রযাত্রাকে পথ দেখায় মূলত দুটি বিষয়—সম্পর্ক ও কর্ম। যে সম্পর্কে উষ্ণতা, ভালোবাসা ও স্নেহ থাকে, সেটা মানুষকে ইতিবাচক শক্তি জোগায়। সে সম্পর্ক শুধু স্বামী-স্ত্রীরই হতে হবে, এমন নয়। হতে পারে পরিবারের অন্য কারো সঙ্গে, বন্ধুর সঙ্গে বা প্রতিবেশীর সঙ্গে। এমনকি গোত্র, সমাজ বা দেশের সঙ্গে সম্পর্কও জোগাতে পারে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বাইরে বেরিয়ে যখনই কারো ভালো থাকার সঙ্গে নিজের ভালো থাকাকে সম্পর্কিত করা যায়, তখনই সেটা মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উত্স হয়ে ওঠে। আবার যখন মানুষ নিজস্ব প্রয়োজন বা পেশার বাইরে গিয়ে অন্য কারো জন্য কাজ করে, তা মানুষকে এগিয়ে নেয়। এসব সম্পর্ক ও কর্মের মাধ্যমেই একজনের ব্যক্তিত্বের সমৃদ্ধি ঘটে। কেউ যদি দাম্পত্যে না জড়িয়ে অন্য কোনো সম্পর্ক থেকে এই অনুপ্রেরণা গ্রহণ করতে পারেন, তাতে তাঁর কর্ম আরো বেশি সমাজমুখী হবে সন্দেহ নেই। তবে দাম্পত্য তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, এমনটিও নয়।

একা থাকার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মেনে চললে গোছানো জীবন যাপন সম্ভব—

♦ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। অন্য কারো ওপর নির্ভরশীল থাকাটা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। হঠাত্ কোনো সংকটে তিনি সাহায্য না-ও করতে পারেন।

♦ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করতে হবে। নয়তো শেষ বয়সে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা মুশকিল হবে।

♦ শেষ বয়সে বসবাসের স্থান আগেই ঠিক করতে হবে। কারণ শেষ বয়সে মানুষকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। সঙ্গী বা সন্তান না থাকায় সেগুলোর সমাধান আগেই নির্ধারণ করে নেওয়া ভালো।

♦ অসুস্থতায়, বিভিন্ন বিপদে বা শেষ বয়সে জরুরি প্রয়োজনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, সেটা ঠিক করে রাখা দরকার।

♦ নিজের শরীরের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে। নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে। কারণ শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে নিজের দেখাশোনা নিজেকেই করতে হবে।

♦ গুরুত্ব দিতে হবে মানসিকভাবে ভালো থাকার ওপরও। নিজের ওপর রাখতে হবে পূর্ণ আত্মবিশ্বাস। মন ভালো করার মতো কাজ প্রতিদিন অন্তত একটি করে করতে হবে। সে কাজগুলো করে এমন আরো যারা আছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা যেতে পারে। সেটা বন্ধু, সহকর্মী বা অন্য কেউ হতে পারে। এই সম্পর্ক হবে স্রেফ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এতে মানসিক উদ্বেগ কমবে।

♦ বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে যুক্ত করা যেতে পারে। বইপড়া, ছবি দেখা বা নানা রকম মানুষের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে তাদের ভিন্ন ভিন্ন ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হওয়া।

♦ সেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন। সমস্যায় থাকা কোনো বন্ধুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, অসুস্থ কারো সঙ্গে একবেলা হাসপাতালে থাকা, পেশাগত দায়িত্বের বাইরে কাউকে বিনা মূল্যে সেবা দেওয়া—এভাবেও মানুষকে সাহায্য করা যায়। এগুলোর মধ্য দিয়ে নিজের ও সমাজের কাছে নিজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা যায়।

♦ যতটা সম্ভব বেশি মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, আশপাশের মানুষগুলো যেন ইতিবাচক মানসিকতার হয়। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ, যারা সুযোগ পেলেই একা থাকা নিয়ে কটাক্ষ করে, তাদের সঙ্গ এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

Check Also

যে ৩ প্রশ্ন প্রেমিককে করবেন না

দুটো মানুষ কাছে আসে ভালো যোগাযোগের মাধ্যমে। সারাটা দিন কেমন গেল, কার কার সঙ্গে দেখা …