ছবিটি শুধুই স্মৃতি

এ ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি।চার বছরের শিশু মানিজুর মাশিয়াব আর কখনো তার মা আফরোজা তাবাসসুম তিথীর ডাক শুনতে পাবে না। মায়ের আদর-ভালোবাসা থেকে চিরতরে বঞ্চিত হলো মাশিয়াব।তাদের এই ছবি দেখে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন শিশুটির বাবা মঞ্জুর হোসেন।মঞ্জুর তার স্ত্রীকে হারিয়ে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে নির্বাক হয়ে গেছেন। অকালে মা হারানো সন্তানকে নিয়ে চিন্তার আকাশ তার মাথার উপর চেপে বসেছে।

শুক্রবার রাত ১টার দিকে যশোর শহরে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও পরে একটি বাড়ির প্রাচীরের সাথে ধাক্কা লেগে শিশু মাশিয়াবের মা আফরোজা তাবাসসুম তিথী (২৬) মারা যান। আর আহত হয় শিশুটি।আর এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন যশোর শহরের ঢাকা রোডের তালতলা এলাকার ইয়াসিন আলীর বড় মেয়ে তানজিলা ইয়াসমিন ইয়াসা (২৮) ও সদ্য এমবিবিএস পাস করা ছোট মেয়ে তনিমা ইয়াসমিন পিয়াসা (২৫)। আফরোজা তাবাসসুম তিথী (২৬) ছিলেন এদের খালাতো ভাইয়ের স্ত্রী। প্রাইভেটকার চালাচ্ছিলেন পিয়াসার স্বামী শফিকুল ইসলাম জ্যোতি (২৮)। এ সময় জ্যোতির দুই বন্ধু শাহিন (২৩) ও হৃদয় (২৮) একই গাড়িতে ছিলেন এবং তারা আহত হন।

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, প্রাইভেটকার চালক শফিকুল ইসলাম জ্যোতি পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। গাড়ি চালানোর সময় তিনি নেশা অবস্থায় ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাদক পরীক্ষার (ডোপ টেস্ট) জন্য তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, নিহতের পরিবারের সদস্যদের আবেদনের ভিত্তিতে মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

নিহতের স্বজনরা জানান, যশোর শহরের লোন অফিসপাড়া এলাকার ঠিকাদার ও গাড়ি ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জ্যোতির সঙ্গে আদ্ব-দ্বীন সখিনা মেডিকেল থেকে সদ্য এমবিবিএস পাস করা তনিমা ইয়াসমিন পিয়াসার দেড় বছর আগে বিয়ে হয়। আগামী ২৩ জানুয়ারি বিবাহত্তোর অনুষ্ঠানের দিন ছিল। সে জন্য জ্যোতির বাড়িতে আলোকসজ্জা করা হয়।

পিয়াসা রাতে ফোন করে জ্যোতিকে জানান, তারা আলোকসজ্জা দেখবেন এবং শহর ঘুরবেন। এ কারণে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে জ্যোতি তার নিজস্ব প্রাইভেটকার নিয়ে বের হন। গাড়িতে পিয়াসার বড় বোন তানজিলা, খালাত ভাইয়ের স্ত্রী আফরোজা তাবাসসুম তিথী, তার মেয়ে মানিজুর মাশিয়াব এবং জ্যোতির দুই বন্ধু হৃদয় ও শাহিন ছিলেন। তারা রাতে আলোকসজ্জা দেখে শহরে তাদের স্বজনদের দাওয়াত দিয়ে রাত দেড়টার দিকে শহরের পালবাড়ি এলাকা থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। ফেরার সময় শহরের পুরাতন কসবার শহীদ মসিয়ূর রহমান সড়কের আকিজের গলির পাশে একটি বিদ্যুতের খাম্বায় সজোরে আঘাত করে প্রাইভেটকারটি।পরে ধাক্কা লাগে একটি ভবনের প্রাচীরের সাথে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন মারা যান। গাড়িতে থাকা অন্যরা আহত হন।

যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. কাজল কান্তি মল্লিক জানান, হাসপাতালে আনার আগেই ওই তিনজনের মৃত্যু হয়।

নিহত তিথির স্বামী মঞ্জুর হোসেন জানান, শুক্রবার রাতে শফিকুল ইসলাম জ্যোতি প্রাইভেটকার নিয়ে আমাদের বাসায় যান। শহরে ঘুরতে বের হওয়ার কথা বলে গাড়িতে আমার স্ত্রী-সন্তানকে তুলে নেন।তারপরই এ ঘটনা ঘটে।কথা বলার সময় তিনি বার বার মূর্ছা যান।

এদিকে দুই মেয়েকে হারিয়ে বার বার মূর্ছা যান ইয়াসিন আলী ও তার স্ত্রী রেহেনা পারভীন হিরা।তাদের আর কোনো সন্তান নেই।ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে।সমবেদনা জানাতে হাজার হাজার মানুষ নিহতদের বাড়িতে আসেন। তাদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজনরদের ভিড়।ঘরের মধ্যে নিহত দুই বোনের মায়ের আহাজারি।দুই সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় মা রেহেনা পারভীন হিরাকে সান্তনা দিতে ভাষা পাচ্ছেন না স্বজনরা।বাবা মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী নির্বাক হয়ে গেছেন।মায়ের কণ্ঠে শুধু সন্তান হারানোর প্রলাপ।শুধু বলছেন, ‘আমার আর মা বলে ডাকার কেউ থাকলো না।আল্লাহ তুমি আমার কলিজা দুটো কেড়ে নিলে।আমি কাদের নিয়ে বাঁচবো।’

Check Also

অবশেষে ধরা খেলেন ‘সার্জেন্ট ইমরান আমার বন্ধু’ লেখা সেই বাইকার

বাইকের পেছনে নেমপ্লেটে লেখা ‘সার্জেন্ট ইমরান আমার বন্ধু’। এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ভাইরাল …