জ্বর নিয়েই লেখাটা লিখতে হলো, দোয়া করবেন, নিজেরাও সাবধানে থাকবেন


ডা. মিথিলা ফেরদৌস

১৬ তারিখ রাতে ১০০ ডিগ্রি সাথে শুকনা কাশি। ১৭ তারিখে জ্বর বেড়ে ১০১ এর উপরে কাশি রয়েই গেলো, সাথে প্রচন্ড মাসেল আর জয়েন্ট পেইন এবং মাথায় ব্যাথা চোখ খুলতে পারছিলাম না। সব ধরনের প্যারাসিটামল খেলাম, একবিন্দু জ্বর কমেনি। ১৮ তারিখে জ্বর বেড়ে ১০৪। কোনো কিছুতেই এক ডিগ্রিও জ্বর কমছে না।

বাসায় বাচ্চা, জামাই। নিজেই ডিসিশন নিলাম, করোনার জন্যে যেসব হাসপাতালে ব্যবস্থা করা হয়েছে চলে যাই। কিন্তু দুইটা হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানলাম, আসলে নামে মাত্র ব্যবস্থা, সেখানে যাওয়ার চেয়ে বাসায় থাকাই ভাল। বাসায় অন্যদের কথা ভাবতেও ভয় করছে। নিজের চেয়েও ওরা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পর্কিত খবর

আতঙ্কে ডাক্তার-নার্সরা, জ্বর-কাশির রোগীদের চিকিৎসা নেই
করোনাভাইরাস রোধে হোম কোয়ারেন্টিনের সিদ্ধান্ত বোকামি
বুলগেরিয়ায় করোনার ভয়ে চাকরি ছাড়লেন ৮৪ চিকিৎসক!

একজন পরিচিত মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে ফোন করলাম, জ্বরের প্যাটার্ন শুনে বললেন, ব্যাপারটা চিন্তারই। যেহেতু করোনা পরীক্ষার ব্যাপারটা কঠিন হয়ে গেছে। আপাতত একটা এক্সরে চেস্ট আর সিবিসি করা যেতে পারে।

ডাক্তারদের জন্যে সবসময়ই এগিয়ে আসা এক ছোটভাইকে ফোন করে, আইইডিসিআর এ স্যাম্পল পাঠানোর জন্যে আরেক ছোটভাইকে বলি। সে সবটি শুনে,বলে,আপনার টেস্ট এই মুহুর্তে সবচেয়ে জরুরি। কারণ আপনার পাবলিক এক্সপোসার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু আমাদের অবস্থা তো বুঝতেই পারতেছেন আপা, কি পরিমাণ চাপের মুখে আছি! তবুও আপনার জন্যে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। আপাতত বাসা থেকে বের হবেন না।

আমি বুঝি,তাদের স্বল্প কিট, লাখ লাখ স্যাম্পল কি করবে বেচারারা? এখন মূল ব্যাপারে আসি। হাসপাতালে আমি কাজ করি আউটডোরে। এমনিতেই এখানে কারণে অকারণে রোগী বেশি আসে। করোনা আসার পর, এদের সংখ্যা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। আগে হয়তো রোগী একটু কমলে পিয়নকে বলতাম রোগী জমিয়ে আমাকে ডাক দিয়েন, উপরে অফিসিয়াল অন্য কাজ থাকে। এই কয়দিন একটুও রেস্ট পাইনি। একটুও যদি বের হইছি, সাথে সাথেই পিয়নের ফোন, ম্যাডাম রোগী অনেক। দৌঁড়ে আসি। হাসপাতালে যে হাঁটবো তার জায়গাই নাই। মানুষ সরায়ে সরায়ে নিজের করিডোরে তারপর রুমে।

প্রতিটা রোগীর গায়ে হয়তো হাত দিতে হয় না, কিন্তু অনেক রোগীকে এক্সামিন করতে হয়। একটা গ্লাভস দিয়ে হয়তো নিজের প্রটেশন হয়, কিন্তু রোগীর প্রটেকশন হয় কি? আমরা রোগীদের খুব কাছে থাকি, চাইলে নিরাপদ দূরত্বে থাকা সম্ভব না। এই রোগীদের মধ্যে কে ইনফেক্টেড তাও আমরা জানিনা।

আচ্ছা আমাদের কথা নাহয় বাদই দিলাম, কারণ আপনাদের অনেকের মধ্যেই টেন্ডেসী দেখতেছি, ডাক্তার মরে মরুক।আমরাও মরলেই আসলে বেঁচে যাই। কিন্তু এই যে, আপনারা ঘন্টার পর ঘন্টা ওপিডির বিশাল লাইনে গায়ে গা ঘেষে দাড়িয়ে থাকেন, অথবা টেস্টের জন্যে টাকা দিতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন অথবা ঔষধ নেয়ার জন্যে বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন।আপনারা কি বুঝতেছেন, কি বিশাল ঝুকির মধ্যে আপনারা আছেন? আপনার পাশের লোকটিই যে, ইনফেকটেড না কে বলতে পারে?

যেকোনও হাসপাতাল কতৃপক্ষের উচিৎ এই ব্যাপারে সচেতন করা। পারলে ওপিডি বন্ধ করা, না পারলেও স্বল্প পরিসরে ওপিডি চালু রাখা। এই দুর্যোগে প্রত্যেকটা নাগরিকের কর্তব্য নিজে সতর্ক থাকা,অন্যকে সতর্ক করা।

খুব অসহায় লাগে,যখন দেখি,আপনারা ডাক্তারদের নিরাপত্তা নিয়ে তো ভাবেনই না,উলটা এই দুর্যোগ মুহুর্তে ডাক্তারদের গালিগালাজ করেন।যাদের গালিগালাজ করা দরকার তাদের গালিগালাজ করতে তো সাহসে আপনাদের কুলায় না,আপনারা বিদ্রোহী দুর্বলের বিরুদ্ধে।সবলের বিরুদ্ধে আপনারা বোবা, কালা, অন্ধ।

যারা গালি দেন তাদের কাছে জানতে ইচ্ছে করে, আপনারা কখনওই কি কোনও ডাক্তারদের কাছে কোনও উপকারই পান নাই? এই দুঃসময়ে আপনারা কি চাইলে অন্যদেশে যেতে পারবেন চিকিৎসার জন্যে?

গালি দেন যা খুশি করেন, আমরা ডাক্তাররা আপনাদের পাশেই থাকবো। আমাদের সুরক্ষার জন্যে না ভাবুন অন্তত নিজেদের সুরক্ষার জন্যে হলেও ছোটখাটো কারনে হাসপাতাল এড়িয়ে চলুন। আর আপনাদের সুরক্ষার জন্যেই ডাক্তারদের পিছে না লেগে, নীতিনির্ধারকদের বলুন বাজেট বাড়াতে। বুকের পাটা যেখানে দেখানোর সেখানে দেখান।

মিডিয়াকেও বলবো এই দুঃসময়ে ডাক্তারদের পিছে না লেগে জনগণকে সচেতন করুন, ডাক্তার তথা জনগণের সুরক্ষার জন্যে কথা বলুন। ডাক্তার পিছে লেগে থাকলে সমস্যার সমাধান তো হবেই না,বরং সমস্যা আরও গুরুতর আকার ধারণ করবে। দিনের পর দিন ডাক্তাররা আক্রান্ত হতেই থাকবে,এ কসময় চিকিৎসা দেয়ার মত কবিরাজ আর তাবিজ কবজ থানকুনি পাতা ছাড়া কিছুই পাবেন না।

লেখক: বিসিএস স্বাস্থ্য। সাবেক শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ।

Check Also

নুসরাত জাহান রাফি হত্যা: ১৬ জন আসামীর সবার মৃত্যুদণ্ড

রাফি হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধন হয়েছিল। বাংলাদেশের ফেনী জেলার সোনাগাজীতে …