আমি ভয় পাচ্ছি, ভীষণ ভয় পাচ্ছি

করোনা ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য হলো অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ এটা। জি এক সময় সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে। আজ সিলেটে একজন ডাক্তার কোভিড ১৯ পজিটিভ পাওয়া গেলো। তাহলে এখন চিন্তা করুন, গত কয়দিনে কারা কারা তাঁর সংস্পর্শে এসেছিলেন। সবাই কোয়ারেন্টিনে চলে যান নিজে থেকে।

সময় এখন এমনই। নিজেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারো জন্য অপেক্ষা করে সময় নষ্ট করার সময় নেই। সিলেটে বিদেশ থেকে আগত মানুষের সংখ্যা সবসময়ই বেশী।

বিশ্বাস করুন, আমি গতকাল থেকে ভীষণ ভয় পাচ্ছি। মিরপুরে থাকি। মিরপুর আর বাসাবো ক্লাস্টার জোন এখন।

আমি ভয় পাচ্ছি কারণ পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে চলেছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে আক্রান্ত হবার সংখ্যা। একদম তীব্র বেগে বাড়বে।

আমি ভয় পাচ্ছি কারণ আমরা সচেতন নই। সবাই সব শুনছি, দেখছি আর ভাবছি আমারতো হয়নি। আর যার হয় হোক, আমি তো ভাল আছি। আপনিও ভাল থাকতে পারবেন না, কখনোই পারবেন না। হলফ করে বলছি আমি….

আমি ভয় পাচ্ছি কারণ আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে চিকিৎসা সামগ্রী নেই। আপনি অসুস্থ হয়ে আসলে ভেন্টিলেটর পাবেন কিনা সন্দেহ আছে। অনেক মানুষ আক্রান্ত হলে কে কাকে কোথায় চিকিৎসা দেবে? আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। আইসিইউ চিকিৎসক এত কোথায় পাবো?

আমি ভয় পাচ্ছি কারণ আপনারা কেউ মালুম করছেন না গুরুত্ব।

এখনো টাটকা ফল, সব্জি কিনতে বাজারে যাচ্ছেন। এখনো চায়ের দোকানে করোনা নিয়ে বিজ্ঞ মতামত দিচ্ছেন। আপনারা স্বাভাবিক জীবন যাত্রার মান বাজায় রাখতে সচেষ্ট। বিশ্বাস করুন এটা যুদ্ধাবস্থা। একটু মানতে চেষ্টা করুন এখন এসবের চেয়ে ঘরে থাকাটা জরুরী। লবন দিয়ে ডলে ভাত খেলেও ঘরে থাকুন।

আমি ভয় পাচ্ছি কারণ সামনে শবেবরাত। রাতভর এবাদত বন্দেগি করতে আপনারা মসজিদে নফল নামাজ আদায় করতে যাবেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকবে না। ঘরে নামাজ পড়ুন। আপনার নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের জন্য।

আমি ভয় পাচ্ছি কারণ এখনো আমরা আসলে কতজন আক্রান্ত সেই হিসাব জানি না। আসলেই আমরা কোন পর্যায়ে আছি সেটা জানি না। আরো কতজন কোভিড ১৯ পজিটিভ হয়ে আমাদের সাথে মিশে আছেন আমরা জানি না। এমনকি আমি নিজেই আক্রান্ত কিনা তাও জানি না। বাহাদুরি করার সময় এটা নয়। প্লিজ ঘরে থাকুন।

আমি ভয় পাচ্ছি কারণ আমাদের অনেক মানুষ গ্রামে থাকে,তারা এসব সম্বন্ধে তেমন কিছুই জানে না। তাদের জীবনযাপন রোজকার মতই চলছে। তারা সচেতন হবার সুযোগ নেই। গতকাল যারা দলে দলে চাকরির জন্য, জীবিকার জন্য, বেতনের জন্য ঢাকা অভিমুখে এলেন, তারা কতজন পজিটিভ আমরা জানি না।

আমি ভয় পাচ্ছি কারণ আমরা উটপাখির মত বালিতে মুখ গুঁজে থাকি আর ভাবি সব ঠিকঠাক। বিশ্বাস করুন কিছুই ঠিক নেই, আর ঠিক থাকবে না কিছুই।

স্বস্তির কথা হলো গনস্বাস্থ্যের টেষ্ট করার কিটের কাঁচামাল এসে পৌঁছেছে। আগামী এগারো তারিখে ইনশাআল্লাহ এগুলো হস্তান্তর হবে। আশাবাদী হই…. বিশাল পরিসরে টেষ্ট করা যাবে।

আশাবাদী হই ১৪’এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি বেড়েছে। ছুটি শব্দটার সাথে আবার আনন্দ, মৌজ মাস্তি, ঘোরাঘুরি, আড্ডা জড়িয়ে থাকে। বিশ্বাস করুন এটা ছুটি নয়। আপনাদেরকে ঘরে রাখার প্রয়াস। ঘরে থাকুন।

যারা লুকিয়ে দোকানপাট খুলছেন, লুকিয়ে ঘুরছেন, পুলিশের সাথে চোরপলান্তি খেলছেন…. বিশ্বাস করুন আপনারা নিজেকেই ঠকিয়ে যাচ্ছেন অবিরত। সামাজিক দূরত্বে থাকুন।

যারা এখনো বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছেন না, যারা নিয়মিতভাবে অনিয়ম করছেন…. বিশ্বাস করুন আপনারা নিজেকেই মৃত্যুর মিছিল সামিল করতে বদ্ধপরিকর। আমি ভয় পাচ্ছি, ভীষণ ভয় পাচ্ছি।

আপনারা ভয়ংকর রকমের সাহসী হবার অপপ্রয়াস করছেন। আপনারা বোকামি করছেন।

প্লিজ ভয় করুন আর ভয়কে জয় করতে দৃঢ় সংকল্প করুন। ভয় না পেলে সচেতনতা আসবে না। আর আপনারা সঠিক পথ চিনবেন না।
এটা আমাদের জন্য একটা অভিশপ্ত সময়। এটা আমাদের জন্য একটা ঘোর অমানিশা।

বিশ্বাস করুন আলো আসবেই…. ততদিন ভয়ে থাকুন, ঘরে থাকুন।

পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে সময় লাগবে না কিন্তু! তখন আপনারা ভয় পেয়েও আর কিছুই করতে পারবেন না। প্লিজ ঘরে থাকুন।

বারবার সাবান পানিতে কমপক্ষে বিশ সেকেন্ড হাত ধুয়ে নিন।

এমনটি নয় যে যা মনে চাইছে তাই করে এসে সাবান জলে শুদ্ধ হবেন।
এটা ভাবাটাও কিন্তু আত্মঘাতী!

আপনারা নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করতে চান না। ঘরে না থাকলে সেটা হবে আত্মহত্যার নামান্তর।

আমি ভয়ে সিঁটিয়ে আছি। আমার দম আটকে আসছে। আপনাদের জন্য আমার ভীষণ ভয় করছে। আমার জন্য আমার ভীষণ ভয় করছে। আমি ভয়ে দিশাহারা হতে চাই না। মাথা শান্ত রেখে ভয়কে জয় করতে চাই। আপনারাও আসুন…. ভয়কে জয় করুন দৃঢ়তার সাথে।

শুভকামনা আপনার জন্য। সুন্দর পৃথিবীর জন্য একটু নিজেকে আড়াল রাখুন, একা থাকুন, ঘরেই থাকুন। আর সুদিনের প্রত্যাশাটুকু বাঁচিয়ে রাখুন।

#করোনা_ফ্যাক্ট

ফারহানা নীলা
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা।

(লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া)

Check Also

করোনায় দেশে সর্বোচ্চ ৪০ মৃত্যুর রেকর্ড

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে মোট মৃতের …