করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ডা. শহীদুল্লাহ যে পরামর্শ দিলেন

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সদ্য সাবেক উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) ও বর্তমানে চর্মরোগ ও যৌনব্যাধি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার সুস্থ হয়েছেন।

গতকাল বাংলাদেশের এক জাতীয় দৈনিকের সাথে আলাপকালে করোনা আক্রান্ত রোগীদের তিনি বিভিন্ন পরামর্শ দিলেন, ‘আক্রান্ত হলেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে- এমন নয়। বাসায় থেকেই দৃঢ় মনোবল, সঠিক পরিচর্যা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমেই করোনাকে জয় করা যায়।’ তিনি বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে পরিবারের সদস্য কিংবা প্রতিবেশীদের অমানবিক হওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, একঘর থেকে আরেক ঘরে করোনাভাইরাস ছড়ায় না। আক্রান্ত লোকের হাঁচি-কাশির মাধ্যমে করোনাভাইরাস অন্যের শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দেহে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু এটি বায়ুবাহিত রোগ নয়। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকতে পারলে এ ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘আমি আবার চিকিৎসায় ফিরতে চাই, আমি করোনা রোগীর সেবা করতে চাই।’ অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, মনে রাখতে হবে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে কোনোভাবেই অমানবিক আচরণ করা যাবে না। পরিবারের সদস্যদের অবহেলা করা চলবে না। আক্রান্ত ব্যক্তিকে একটি রুমে রাখতে হবে। দূরত্ব বজায় রেখে সেবা করতে হবে। অন্যদিকে আক্রান্ত ব্যক্তি বা পরিবারকে সামাজিক, পারিবারিক, অমানবিক হওয়া যাবে না। মানবতাকে সামনে রেখে রাজনৈতিক চিন্তা, ধর্ম, বর্ণ ঊর্ধ্বে রেখে মানবতার মাধ্যমেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।

করোনায় আক্রান্ত থেকে সুস্থ হওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, করোনাভাইরাসের প্রধান লক্ষণ- জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, গায়ে ব্যথা। এই সংক্রমণ সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতোই। এতে জ্বর আসে, শুকনো কাশি হয়। এই লক্ষণগুলো প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। করোনা আক্রান্ত হলেই সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি নয়। বাসায় থেকে সঠিকভাবে স্বাস্থ্য পরিচর্চার মাধ্যমে বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যায় এমন পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। যেমন ভিটামিন সি, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, জিং ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ খাবার। এর মধ্যে আমড়া, পেয়ারা, লেবু, কমলা, মাল্টা, আপেল এবং দেশি মৌসুমি ফল। তিনি বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রতিদিন একাধিক ডিম খেতে হবে। তবে যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ রয়েছে তাদের ডিমের কুসুম বাদ দিয়ে খাওয়াই ভালো। মনে রাখতে হবে অন্যান্য প্রোটিন জাতীয় খাবার ও শাকসবজি খাওয়াও প্রয়োজন। প্রচুর পরিমাণে গরম পানি খেতে হবে। গরম পানিতে গড়গড়া করা এবং গরম পানির ভাপ নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া কালোজিরা মধুর সঙ্গে খেলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। রসুন, আদা, দারুচিনি, লবঙ্গ ইত্যাদি করোনাভাইরাসের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা রয়েছে। মনে রাখতে হবে কখনই ঠান্ডা লাগানো যাবে না। ভাইরাস যদি ফুসফুসে বেশ চেপে বসে তাহলে আপনার শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়া হতে পারে। যাদের হাঁপানি আছে তাদের জন্য এই ভাইরাস ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’। কারণ যাদের হাঁপানি আছে তাদের করোনাভাইরাসের মতো জীবাণুর সংক্রমণ হলে তাদের হাঁপানির লক্ষণগুলো বেড়ে যাবে। আর সে কারণেই হাঁপানির সমস্যা যাদের আছে তারা ঘর থেকে বের হবেন না। বেশি লোকের সঙ্গে মেলামেশা এ ধরনের ঝুঁকিতে থাকা লোকদের জন্য ভয়ের কারণ। কেননা আপনি জানেন না কে এই জীবাণু শরীরে বহন করছে। এ জন্য সবার উচিত সামাজিক মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া। এর একটা উপায় হলো বাাড়িতে থাকা, যতটা সম্ভব বাইরে না বেরুনো। আর যদি বেরুতেই হয় তাহলে অন্য মানুষের চাইতে অন্তত দুই মিটার বা ৬ ফিট দূরে থাকা প্রয়োজন। আর করোনাভাইরাস বাসা বাঁধে তার শরীরের আর কোথাও নয়, এই ফুসফুস এবং শ্বাসতন্ত্রেই। সুতরাং যদি এই কাশি দেওয়া লোকটি ইতিমধ্যেই সংক্রমিত হয়ে থাকেন- তাহলে জানবেন, তার প্রতিটি কাশি হাঁচির সঙ্গে নির্গমন হয়। এই ভাইরাসের বাহন হলো কাশির সঙ্গে বেরিয়ে আসা অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানির বিন্দুগুলোই- যাকে ইংরেজিতে বলে ড্রপলেট। এই ড্রপলেটগুলোর বেশিরভাগই দুই মিটারের বেশি যেতে পারে না। মনে রাখতে হবে করোনাভাইরাস ফুসফুস ও নাক ও শ্বাসনালির অংশকে আক্রান্ত করে। এটা কখনো খাদ্যনালি বা অন্যান্য অঙ্গকে আক্রান্ত করে না। সাধারণত করোনা অন্যান্য অঙ্গকে আক্রান্ত করে না। নিঃশ্বাসে সমস্যা হলে বা বুকে ব্যথা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যেতে পারে। সঠিক খাবার, স্বাভাবিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার মাধ্যমে করোনা রোগী সেরে উঠতে পারেন। ভীত না হয়ে সব সময় সচেতন হয়ে নিজে সুস্থ থাকুন, অন্যকে সুস্থ রাখুন। আক্রান্ত ব্যক্তি যদি বাসায় থাকেন, তাহলে আলাদা রুমে থাকবেন। একাধিক আক্রান্ত ব্যক্তি এক রুমে থাকতে পারেন। কিন্তু সুস্থ ব্যক্তিকে আলাদা রুমে থাকতে হবে।

প্রসঙ্গত, গত ৮ এপ্রিল করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ টেস্টে ডা. শহীদুল্লাহ সিকদারের করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। তার কন্যা নীলিমা সিকদার ধরিত্রীরও নমুনা টেস্টে করোনাভাইরাস পজেটিভ এসেছিল। গত মঙ্গলবার দুজনেরই নমুনা টেস্টে ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। বর্তমানে তারা দুজনই সুস্থ আছেন এবং করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত হয়েছেন। অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার ও তার কন্যার করোনাভাইরাস থেকে সুস্থ হওয়ায় সব শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি বিশেষ করে তার জন্য যারা দোয়া করেছেন, এই সময়ে তার খোঁজ-খবর রেখেছেন এমন সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়াও তিনি দেশবাসীর দোয়া কামনা করেছেন এবং বর্তমান অবস্থায় দেশবাসীকে বঙ্গবন্ধুকন্যা, যিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে করোনার ভয়াবহতা থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য দেশবাসীর প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপ-উপাচার্য কোনো হাসপাতালে ভর্তি হননি। তিনি নিজ বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিয়েছেন। কেমন করে সময় কাটিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই সময়ে প্রচুর বই পড়েছি। শাহ আবদুল করিম, রবীন্দ্রনাথ, লালনগীতি, নজরুলগীতি, পল্লীগীতি, লোকগীতিসহ অনেক গুণী শিল্পীর গান শুনেছি, বই পড়েছি, চিকিৎসা বিজ্ঞানের বই, বঙ্গবন্ধুসহ বিশিষ্ট ব্যক্তির আত্মজীবনীমূলক বই, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রবন্ধ পড়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছি। আমাকে ও মেয়েকে আমার স্ত্রী খুব সহযোগিতা করেছেন। আমি আবার চিকিৎসায় ফিরতে চাই, আমি করোনা রোগীর সেবা করতে চাই।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Check Also

কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের পর আত্মহত্যা বলে চালানোর অভিযোগ

নওগাঁর পত্নীতলায় অনুমোদনহীন নজিপুর ইসলামিয়া ক্লিনিক এন্ড ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার রিসিপসনিস্ট পদে কর্মরত তানিয়া আকতার …