টেস্ট নিয়ে কী হচ্ছে!

তিন দিন চেষ্টা করেও টেস্ট করাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন করোনায় প্রাণ হারানো ডিএসসিসির কর্মকর্র্তা গায়ে গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে নমুনা, ভোগান্তির শেষ নেই।

করোনাভাইরাসের টেস্ট করতে গিয়ে ভোগান্তি যেন শেষ হচ্ছেই না। চাইলেও করানো যাচ্ছে টেস্ট। ঘুরতে হচ্ছে দিনের পর দিন। ঘুরতে ঘুরতে রোগীর মৃত্যু হলেও টেস্ট হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে টেস্ট টেস্ট ও টেস্টের কথা বলা হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। যেখানে টেস্ট করা হচ্ছে সেখানকার পরিবেশ নিয়েও রয়েছে নানান প্রশ্ন। কোথাও গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আবার কোথাও একই ঘরের মধ্যে নমুনা পরীক্ষা করতে যাওয়া সবাইকে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। সেখানেই গায়ে গা লাগিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে সম্ভাব্য পজিটিভ ও নেগেটিভ রোগীকে। আবার করোনা টেস্ট ছাড়া সাধারণ কোনো রোগীকেও ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না হাসপাতালগুলোয়। কিন্তু টেস্টের এই দীর্ঘ ভোগান্তি শেষ করতে করতে রোগীই বিদায় নিচ্ছেন পৃথিবী থেকে। এর মধ্যেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আবিষ্কৃত কিট নিয়ে নেতিবাচক ঘটনাপ্রবাহ হতাশ করছে দেশবাসীকে। জানা যায়, গত ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক উপদেষ্টা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম তিন দিন ধরে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কাছে ঘুরেও করোনা টেস্ট করাতে পারেননি। এমনকি মৃত্যুর পরও এই কর্মকর্তার নমুনা নিতে আসেননি আইইডিসিআরের কেউ। সংশ্লিষ্ট কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ না দেখে তাই দাফনের আগে নিজেরাই নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। মহানগর জেনারেল হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক এনে দাফনের আগমুহূর্তে আনা হয় নমুনা। পরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষায় ধরা পড়ে খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আইইডিসিআরের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে সরকারের কাছে অভিযোগ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেও টেস্ট করাতে পারিনি। একজন সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে যদি এ অবস্থা হয় তাহলে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে? আমি সচিব মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। বিষয়টি তিনি লিখিত আকারে জানাতে বলেছেন। আমরা সরকারকে জানাব।’
খন্দকার মিল্লাতুল ইসলামের ছেলে খন্দকার মাজহারুল ইসলাম শাওন নিজেও একজন চিকিৎসক। শাওন বলেন, ‘মৃত্যুর ঠিক দুই দিন আগে বাবার শরীরে জ্বর হয়। এরপর আমরা আইইডিসিআরের হটলাইনে বারবার ফোন দিয়েছি, কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। সর্বশেষ আমি নিজেও আইইডিসিআরে গিয়েছি। তার পরও কোনো হেল্প পাইনি। তারা বলেছেন এখানে কোনো টেস্ট হয় না। অফিস বন্ধ। সেখান থেকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গিয়েছি। তারা বলেছেন তারা করোনা টেস্ট ছাড়া রোগী ভর্তি নেবেন না। তাদের বলেছি অন্তত টেস্টটা করতে। তারা করেননি। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়েছি বাবাকে। তখন ডাক্তার জানিয়েছেন বাবা আর নেই। সব জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে শেষ হয়েছি। নিজে ডাক্তার হয়েও কারও একটু হেল্প পাইনি।’

খন্দকার মিল্লাতুল ইসলামের মতো আরও অনেকেই আছেন, যারা করোনা শনাক্তের টেস্ট করাতে চেষ্টা করেও হটলাইনে সংযোগ পাননি। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সরাসরি আইইডিসিআরের কার্যালয়ে গেলেও তাদের কোনো লাভ হয়নি। আবার যারা যোগাযোগ করতে পেরেছেন এবং টেস্ট করানোর জন্য আইইডিসিআরের তালিকাভুক্ত হয়েছেন তাদেরও কেউ কেউ ভোগান্তিতে পড়েছেন। প্রথমত টেস্ট করানোর জন্য তদবির করতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত তালিকাভুক্ত হয়েও অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে দিনের পর দিন। মিরপুরের তানজিনার বলেন, ‘আমার লক্ষণ শুনে আইইডিসিআর থেকে বলা হয়, আমার করোনা টেস্ট করা হবে। দ্রুত লোক পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু সেদিন টেস্টের জন্য কোনো লোক আসেনি। পরদিনও আসেনি। ফোন করলে বলে দ্রুত পাঠাচ্ছে। এভাবে তিন দিন চলে যায়। এদিকে আমার শ্বাসকষ্ট বাড়ছিল। অবস্থা দেখে আমার পরিচত কয়েকজন তদবিরের চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ দিনের মাথায় এসে স্যাম্পল নিয়ে যায় আইইডিসিআরের লোক।’

করোনা নেগেটিভ অথচ হলো না চিকিৎসা : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার স্কুলছাত্রী সানজিদা ইসলাম সুমাইয়া (১৬) সর্দি, কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হয়। ২৬ মার্চ শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় পরিবার। সেখানকার এক চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা বলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ওই দিন সন্ধ্যায় সানজিদার অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৎক্ষণাৎ এক্স-রে করিয়ে প্রতিবেদন দেখার পর চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তির পরামর্শ দেন। পরে রাত ১টার দিকে ওই স্কুলছাত্রীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। করোনাভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে মেয়েটিকে সেখান থেকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তখন রাত ৩টা। সেখান থেকে চট্টগ্রাম সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে যেতে বলা হয়। রাতে ওই হাসপাতালের সেবা বন্ধ থাকে। তাই শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে মেয়েটিকে চট্টগ্রাম সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেফারেন্স ছাড়া করোনাভাইরাসের টেস্ট করাতে অস্বীকৃতি জানান। এরই মধ্যে অসুস্থ সানজিদার বাবা রফিকুল ইসলাম চট্টগ্রামের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন করোনাভাইরাস পরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়া কোনো হাসপাতালে রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। কোনো উপায় না পেয়ে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন বাবা। গত রবি ও সোমবার দুই দিন মেয়েকে নিয়ে বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু মেয়ের অবস্থার উন্নতি হয়নি। তাই ফের মেয়েকে চিকিৎসা করানোর চেষ্টা শুরু করেন। গতকাল বিকালে চট্টগ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সানজিদার করোনা টেস্ট করানো হয়। টেস্টের রেজাল্ট আসে নেগেটিভ, অর্থাৎ মেয়েটি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয়।

গাদাগাদি করে দাঁড় করিয়ে নেওয়া হচ্ছে নমুনা : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনা টেস্টিং সেন্টারে দেখা গেছে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সাবেক শেরাটন হোটেল ও বারডেম হাসপাতালের মাঝে অবস্থি এই টেস্টিং সেন্টারে করোনা পরীক্ষার লাইন হলেও সেখানে নেই কোনো সামাজিক দূরত্ব। অনেকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নেননি ঠিকমতো। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছেন ভিতরে যাওয়ার অপেক্ষায়। একদিকে পুলিশ, মাঝখানে ডাক্তার-নার্স ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আরেক পাশে সাধারণ মানুষের লাইন। সকাল ৮টার আগে শুরু হওয়া এ লাইনে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কেউ কেউ দীর্ঘ লাইন দেখে ফিরেও যাচ্ছেন। ভিতরে গিয়েও নমুনা দেওয়ার জন্য আবার লাইনে দাঁড়াতে হয়। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনককান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘আমাদের এখানে পরীক্ষার চাপ বেশি। যাদের লক্ষণ নেই তারাও আসছে পরীক্ষা করতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ কিন্তু লক্ষণ দেখা দিলে পরীক্ষা করার। এর পরও আসছেন। এ ক্ষেত্রে তাদেরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি।’

একই কক্ষে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসিয়ে রাখা হচ্ছে : ঢাকা মেডিকেল কলেজে করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহের জন্য একটি কক্ষে দীর্ঘক্ষণ ধরে গায়ে গা ঘেঁষে বসিয়ে রাখা হচ্ছে নমুনা দিতে আসা ব্যক্তিদের। এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে সম্ভাব্য পজিটিভ-নেগেটিভ সবাইকে।

Check Also

বরিশালের বিভিন্ন সড়কে ‘Sorry’ লেখা নিয়ে রহস্য!

বরিশাল নগরীর বেশ কয়েকটি সড়কে রঙ দিয়ে ইংরেজিতে ‘Sorry’ শব্দ লেখা নিয়ে ইতোমধ্যে রহস্যের সৃষ্টি …