তরতাজা তরুণ, কোনো রিস্ক ফ্যাক্টর ছিলো না, তবু বাঁচানো গেল না

করোনার রোগী। বিগত কয়েকদিন মোটামুটি ভালোই ছিল সে। কিন্তু হঠাৎ করেই কি এমন হলো তাকে দ্রুত আইসিইউতে নিয়ে ভেন্টিলেটরে দিতে হলো। তরতাজা তরুণ যুবক। ডায়াবেটিস, অ্যাজমা বা অন্য কোনো রিক্স ফ্যাক্টর যা থাকলে মৃত্যুহার বেড়ে যায় তেমন কিছু ছিলো না। তবু তাকে বাঁচানো গেল না। হঠাৎ মৃত্যু (সাডেন ডেথ) না হলেও কিছুটা সময় ধুকেধুকে সবাইকে জানান দিয়েই সে চলে গেল। এ করোনা মহামারীতে সেই ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর মতোই এমন দৃশ্য যেন বিশ্বজনীন সার্বজনীন প্রবণতা হয়ে গেছে। এর পিছনের কারন কি? কি এমন ঘটে রোগীর শরীরে?

আমাদের দেহে যখন কোন জীবানু ঢুকে তাকে প্রতিহত করার জন্য দিকে দিকে রব পড়ে যায়। মাঠে তথা রক্তে নেমে আসে নানা অতিআণুবীক্ষণিক সৈন্য। অগ্রগামী বাহিনীতে থাকে সাইটোকাইন নামের অতিক্ষুদ্র কণা। এ সাইটোকাইন চারদিক ঘিরে কোষে কোষে সিগন্যাল পাঠাতে থাকে। শুরু হয় জীবনের সাথে জীবানুর যুদ্ধ। সাধারণত যার ইমিউনিটি বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যত শক্তিশালী তত সহজে সে সংক্রমণকে পরাজিত করে দেয়। এই সাইটোকাইন হয়ে উঠে আমাদের বিপদের সুরক্ষা। কিন্তু কারো কারো দেহে ভাইরাসকে পরাভূত করার পরও তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সৈন্য-সামন্তের তর্জন-গর্জন হুংকার আর থামে না। নিজ দেহকোষের বিরুদ্ধেই এ বিপদগামী সাইটোকাইনেরা শুরু করে দেয় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। শুরু হয় সাইটোকাইন স্টর্ম (cytokine storm)। যে লিভার কিডনি ফুসফুস হার্টকে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুরক্ষা দিবে, সেই বিপথগামী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শুরু করে দেয়া কালবোশেখীতে একে একে ভাঙচুর হতে থাকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলি। নিজ সেনাবাহিনীর অসংযত আর্মি লাগামহীন উর্মির মত নিজের উপর দিয়েই বয়ে যেতে থাকে। এর ধকল নিতে পারে না দেহ। ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ সব অঙ্গ কার্যকারিতা হারায়। মানুষটি হয়ে যায় লাশ। এ এক অদ্ভুত যুদ্ধ নিজের সাথেই নিজের।

কিন্তু কেন কিছু মানুষের ইমিউন সিস্টেম এরকম বিপথগামীর মতো আচরণ করে তার কারণ এখনো অজানা। জেনেটিক্স এর মধ্যেই এ কার্যকারণের গোড়া লুকিয়ে আছে কিন্তু সেটা কোথায় কীভাবে সে সম্বন্ধে এখনো নেই কোন অন্তর্দৃষ্টি। এ বাড়াবাড়ি করা সাইটোকাইনিনগুলিকে কিভাবে দমন করা যায় তার উপর চলছে ঔষধ আবিষ্কারের গবেষণা।আমরা কেউ জানিনা আমাদের কার দেহের ইমিউন সিস্টেম সে রকম আচরণ করবে আর কারটা করবে না।

আগে যেমন বলেছি ১৯১৮ সালের ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা অতিমারীতে অনেক তাগদা যুবক মারা গেছেন এই সাইটোকাইন ঝঞ্ঝায়। যেসব যুবকেরা বেঁচে গেছেন তারা চল্লিশ পঞ্চাশ দশকে তাদের বাপ-দাদা বা সন্তান-সন্ততির চেয়ে কম বয়সে মারা গেছেন। এ করোনা ভাইরাসও লুকায়িত কোন ক্ষত রেখে যাবে হয়তো, সেটা সময় বলে দিবে।

ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামার মধ্যে শত্রু মিত্র চিনতে না পেরে এই যে সাইটোকাইন রক্তে সয়লাব হয়ে গিয়ে নিজের দেহটাকেই শেষ করে দেয়-একেই বলে সাইটোকাইন স্টর্ম। দুর্বল ইমিউনি সিস্টেম যখন প্রটেকশন দিতে পারে না সেটা যেমন বিপদ, আবার মিসগাইড ইমিউনি সিস্টেম যখন অতি প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটা আরেক মহাবিপদ।

এই করোনাকালে বহুল উচ্চারিত এক মহা আতঙ্কের নাম এই সাইটোকাইন স্টর্ম।

– ডা. আমিনুল ইসলামের ফেসবুক থেকে

Check Also

বরিশালের বিভিন্ন সড়কে ‘Sorry’ লেখা নিয়ে রহস্য!

বরিশাল নগরীর বেশ কয়েকটি সড়কে রঙ দিয়ে ইংরেজিতে ‘Sorry’ শব্দ লেখা নিয়ে ইতোমধ্যে রহস্যের সৃষ্টি …