ধোঁকা দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল মাজেদ

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনী ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ কলকাতায় মিথ্যা কথা বলে প্রতারণা করে ধোঁকা দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল সেলিনা বেগম ওরফে জরিনা বেগমকে। মাজেদ ঠকিয়েছে দ্বিতীয় স্ত্রীকে। দ্বিতীয় স্ত্রী যখন তার স্বামীর কাছে তার গ্রামের নাম, পরিবারের নাম, ঠিকানা কোথায় তা জানতে চাইতেন, তখন আলী আহমেদ অর্থাৎ খুনী মাজেদ খুব রাগ করে গম্ভীর মুখে বসে থাকত। সরল বিশ্বাসে অতীত ইতিহাস না জেনেই বিয়ে করেছিলেন মাজেদকে। বিয়ে করে ছ’বছরের এক সন্তান নিয়ে দিশেহারা এখন দ্বিতীয় স্ত্রী। শোকে, দুঃখে হতবিহ্বল দ্বিতীয় স্ত্রী ঘন ঘন মূর্ছা যান। দ্বিতীয় স্ত্রী সেলিনা বেগম ওরফে জরিনা বেগম পুলিশের কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন তাতে মাজেদের দ্বিতীয় বিয়ে করাসহ নেপথ্যের অনেক চাঞ্চল্যকর কাহিনী বের হয়ে এসেছে। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক দশক আগে ৮ এপ্রিল ৪০ বছর বয়সী বিধবা সেলিনা বেগম ওরফে জরিনা বেগমকে বিয়ে করেছিল ৭৩ বছর বয়সী স্বামী আলী আহমেদ। কলকাতার এই আলী আহমেদই ঢাকার খুনী ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ। চলতি বছর ছিল তাদের দশম বিবাহবার্ষিকী। তার একদিন আগেই গত ৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মিরপুরে গ্রেফতার হয় বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনী ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ। প্রকৃতপক্ষে খুনী আবদুল মাজেদ পরিচয় লুকিয়ে আলী আহমেদ নামে কলকাতায় বসবাস করছিলেন। সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী গত ১১ এপ্রিল রাত ১২-০১ মিনিটে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আবদুল মাজেদ আলী আহমেদ পরিচয়ে কলকাতায় বসবাস করছিল। সেখানে সে সুদের কারবার ও টিউশনি করে সংসার চালাত। সেখানে তার ভারতীয় পাসপোর্ট ছিল। কলকাতার পার্কস্ট্রিট এলাকার বেডফোর্ড লেনের বাসিন্দারা নম্র, ধার্মিক শিক্ষক হিসেবে জানতেন মাজেদকে। আধার কার্ডসহ সম্পূর্ণ পরিচয় নিশ্চিত করেছিলেন তিনি।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক দশক ধরে বিবাহিত জীবন কাটালেও স্ত্রী সেলিনা বেগম ওরফে জরিনা বেগম ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি তার স্বামী আলী আহমেদ আসলে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর খুনী আবদুল মাজেদ। ঢাকায় গ্রেফতারের পর ঢাকার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ায় তার স্বামীর ছবি প্রকাশ হয় খুনী হিসাবে। তবে তার স্বামীর ছবিতে নাম দেখতে পায় আলী আহমেদ নয়, খুনী ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদের নাম। দ্বিতীয় স্ত্রী এও জানতে পারেন, তার স্বামী ছিলেন মোস্ট ওয়ান্টেড, খুনের মামলার আসামি, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তার ফাঁসির রায় কার্যকর করার অপেক্ষায় আছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, আলী আহমেদ যিনি খুনী মাজেদ কলকাতার নিজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর ২২ ফেব্রুয়ারি সেলিনা বেগম ওরফে জরিনা বেগম স্বামীর খোঁজে স্থানীয় থানায় ‘নিখোঁজ ডায়েরি’ করেছিলেন। কিন্তু যখন জানতে পারেন আলী আহমেদ আসলে বঙ্গবন্ধুর খুনী আবদুল মাজেদ তখন হতবাক হয়ে যান। এখনও তিনি স্বাভাবিক হতে পারেননি, ঘন ঘন মূর্ছা যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।

পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দীতে দ্বিতীয় স্ত্রী সেলিনা বেগম ওরফে জরিনা বেগম বলেছেন, আবদুল মাজেদ সব সময় নীরব ও গম্ভীর থাকতেন। তিনি খুব গম্ভীর ও রাগী প্রকৃতির ছিলেন। অতীত নিয়ে কোন কথা বলতেন না। জানতে চাইলে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে পড়তেন। সব সময় ঘড়ির কাঁটা ধরে চলতেন। খাবার দিতে কিংবা অন্য কোন বিষয়ে একটু দেরি হলেই গালিগালাজ করতে শুরু করতেন। জবানবন্দীতে দ্বিতীয় স্ত্রী বলেছেন, তার যখন ৩১ বছর বয়স তখন আলী আহমেদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, তখন আলী আহমেদ অর্থাৎ খুনী মাজেদের বয়স ছিল ৬৪ বছর।

কলকাতা থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে উলুবেড়িয়া গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের বিধবা নিরক্ষর মহিলা সেলিনা বেগম ওরফে জরিনা বেগম। সেখানে তার আগের সংসারের এক কন্যা নিয়ে বসবাস করতেন। এক প্রতিবেশী আলী আহমেদের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাবটি নিয়ে এসেছিল পরিবারের কাছে। এবং তারা আলী আহমেদের অতীত বা পারিবারিক ইতিহাস না জেনেই সেলিনা বেগম ওরফে জরিনার বিয়ে দিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় স্ত্রী জবানবন্দীতে বলেন, আলী আহমেদ সর্বদা একজন অন্তর্মুখী মানুষ এবং কখনও বেশি কিছু বলেননি। আমি তাকে তার গ্রাম এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সম্পর্কে অনেকবার জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করেছি, তবে তিনি রাগ করতেন। দ্বিতীয় স্ত্রী বলেন, প্রতিবেশীর প্রস্তাব আসায় আমার বাবা-মা আমাকে বিয়ে করিয়েছিলেন। আমাদের জানানো হয়েছিল যে তিনি একজন ধার্মিক ব্যক্তি এবং শিক্ষক ছিলেন। আমি তাকে সর্বদা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে দেখেছি এবং একজন ধার্মিক মুসলমানের জীবনযাপন করতে দেখেছি।

দ্বিতীয় স্ত্রী সেলিনা বেগম ওরফে জরিনা বেগম বলেছেন, তার ভাইয়ের নাম নাজিমুদ্দিন মল্লিক। ভাই এখন একটি গুরুতর স্নায়ুুজনিত রোগে ভুগছেন। তিনি অন্যের করুণা নিয়ে বেঁচে আছেন। জরিনার প্রথম স্বামী একটি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। একা সন্তান নিয়ে জীবনযাপন করা অনেক কষ্টের হয়ে পড়েছিল। বছর দুয়েকের মধ্যে এই দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তাব এলো। আমার পরিবার তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেছে, তবে আমাদের জানানো হয়েছিল যে তিনি একজন শিক্ষক। সেলিনা বেগম ওরফে জরিনাকে সুখী রাখতে তিনি ভাল উপার্জন করেছেন। গত ৭ এপ্রিল ঢাকায় ধরা পড়ার পরের দিন ৮ এপ্রিল সংবাদপত্রের মাধ্যমে আলী আহমেদই যে খুনী মাজেদ তার পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারি।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, ঢাকার খুনী মাজেদ কলকাতায় আলী আহমেদ পরিচয় দিয়ে মিথ্য কথা বলে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সেলিনা বেগম ওরফে জরিনা বেগমকে বিয়ে করে তাকে ঠকিয়েছে। সুদের কারবার, টিউশনি করার আড়ালে বাংলাদেশ থেকে তার জন্য টাকা যেত। যা দিয়ে মাজেদ কলকাতায় বসে অনৈতিক, অসৎ কর্মকান্ড, ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল যা এখন তদন্তে প্রকাশ পাচ্ছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তার দাবি। খবর. জনকণ্ঠ।

Check Also

নারায়ণগঞ্জে ট্রেন থামিয়ে ঝালমুড়ি কিনলেন চালক (ভিডিও)

মাঝপথে ট্রেন থামিয়ে ঝালমুড়ি কিনছেন নারায়ণগঞ্জের এক ট্রেনচালক। তার এ ঝালমুড়ি কেনার ভিডিও এখন সামাজিক …