বিপর্যয়ের মুখে গণস্বাস্থ্যের করোনা কিট, ক্ষতিটা কার? সরকার, ডা. জাফরুল্লাহর না জনগণের!

যখন লিখছি তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বয়ান, ‘করোনাভাইরাস থেকে সেরে উঠার পর আবার আক্রান্ত হবে না এমন কোন প্রমাণ নেই।’ আচ্ছা বলুন তো, এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খারাপ খবর ছাড়া, কোভিড নাইনটিন নিয়ে ভালো খবর কী দিয়েছে? দিয়েছে কিছু? আমার চোখে অন্তত পড়েনি কোনো আশা জাগানিয়া খবর।

সারা গিলবার্টের ভ্যাক্সিন চ্যাডক্স ১ নিয়ে যখন সারা বিশ্বে একটি আশা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুরুগম্ভীর মানে মাস্টার মশাই টাইপ ভূমিকা। এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আতঙ্ক বাড়ানো ছাড়া আশার কোনো কথা শোনাতে পারেনি। কেন জানি ট্র্রাম্পের কথা অন্তত এক্ষেত্রে মিথ্যা মনে হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোথাও না কোথাও কিছু একটা রয়েছে। সারা বিশ্ব যেখানে চেষ্টা করছে ভ্যাক্সিন আর ঔষধ তৈরিতে, তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমন্বয়ের বিষয়টি গোলমেলে। জানি, এ কথায় অনেকে আপত্তি করবেন। তাদের একটু বলি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আজ অবধি কর্মকাণ্ডে ভালো করে চোখ বুলাতে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, আতঙ্ক মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। অথচ সেই আতঙ্কই ছড়ানো হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তরফ থেকে। তারা বিভিন্ন গবেষণার কোনটাই পাত্তা দিচ্ছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে এক ধরণের বিভ্রান্তির।
এ গেলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কথা। আমরা যেহেতু আদার বেপারি তাই জাহাজের খবর বাদ, আসি নিজেদের বেলায়। আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হ-য-ব-র-ল অবস্থা এখন আর গোপন নেই। তাদের দিক থেকে আশাব্যঞ্জক কোন কিছু এখন পর্যন্ত নেই। কোভিড নাইনটিন চিকিৎসায় ঢাকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের রোগীদের একটি ভিডিও ক্লিপই প্রমাণ করে আমাদের বর্তমান অবস্থা।

বিশেষায়িত হাসপাতালের চিকিৎসা যদি এই হয়, তবে অন্যগুলোর কী অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। শ্বাসকষ্টে থাকা একজন রোগীকে অক্সিজেন দেয়ার মত কেউ ছিল না সেই হাসপাতালের পক্ষ থেকে এবং রোগীটি শেষ পর্যন্ত মারা গেছেন। না, এতে চিকিৎসকদের দোষ আমি দিচ্ছি না। যে দেশে মানহীন মাস্ক আর পিপিই চিকিৎসকদের আক্রান্ত করছে, সেখানে চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক আর নার্সদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।

তাদেরও পরিবার-পরিজন রয়েছেন, সঙ্গত কারণে জীবনের ভয়ও রয়েছে। সারাবিশ্বে আমাদের দেশের চিকিৎসাকর্মীদের আক্রান্ত হবার হার এমন কথাই বলে। আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী কোভিডে আক্রান্ত। অনেক হাসপাতাল লকডাউন। এমনিতেই আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। তারমধ্যে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা যদি এভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালগুলো লকডাউন হয় তাহলে নিশ্চিত অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতের চিত্র দুটি মিলিয়ে যে কথা বলছে তা হলো, কদিন পরেই চিকিৎসার সঙ্গে সৃষ্টি হবে মানবিক বিপর্যয়। আমাদের মত দেশে যতই বাগাড়ম্বর করা হোক না কেন, মূল কথা হলো আমরা দরিদ্র। মহামারি আমাদের দরিদ্রতা নির্মমতার সঙ্গে দেখিয়ে দিয়েছে। খাদ্যের জন্য মানুষের ক্রমাগত আহাজারি তারই প্রমাণ।

ব্র্যাক বলছে, দেশে দুই কোটি মানুষের ঘরে খাবার নেই। তার কারণ হলো মূলত লকডাউন। সুতরাং এই লকডাউন আমাদের তুলে নিতে হবে এবং তা দ্রুততম সময়ের মধ্যেই। কিন্তু সে লকডাউন তোলার প্রক্রিয়াটি কী হবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। লকডাউন বলতে গেলে করোনাভাইরাসের চিকিৎসার একটা অংশ। সংক্রমণ রোধ করা যার উদ্দেশ্যে। অথচ লকডাউন দীর্ঘায়িত হলে ক্ষুধার মত ভয়াবহ আরেকটি ‘রোগ’ যার যন্ত্রণা সম্ভবত কোভিড কেন সব রোগের চেয়েও বেশি তা বৃদ্ধি পাবে। সে অর্থে লকডাউন তুলে নেয়া ছাড়া আমাদের কোন উপায়ও নেই। এই লকডাউন তোলার ক্ষেত্রে মহামারির গতি-প্রকৃতি বোঝাটা সবচেয়ে জরুরি।

আর বোঝার জন্য প্রয়োজন দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষকে টেস্টের আওতায় আনা। টেস্টের কোন বিকল্প নেই। অথচ আমাদের দেশে টেস্টের সংখ্যা গুনতে গেলে থমকে যেতে হয়। ১৬ কোটি মানুষের দেশে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ টেস্ট করা হয়েছে তা বলতে গেলে নিজেরই লজ্জা লাগে। মাত্র ২৮টি ল্যাবে পরীক্ষা হবার কথা। তারমধ্যে এখন পর্যন্ত সবকটি চালু করা সম্ভব হয়নি। আর ২৮টি ল্যাব চালু হলেও সব মানুষকে পরীক্ষা করতে গেলে অঙ্কের হিসাবে শত বছর লেগে যাবে। এ অবস্থায় প্রচলিত টেস্টের বিকল্প খুঁজতে হবে আমাদের। যার একটি ভালো বিকল্প ছিল গণস্বাস্থ্যের তৈরি কিট। গণস্বাস্থ্য দাবি করছে, তারা শতভাগ সফল এই কিট দিয়ে কোভিড আক্রান্ত শনাক্তে। কিট তৈরিও করেছে তারা। এখন শুধু প্রয়োজন সরকারের অনুমোদনের। তারা কিট হস্তান্তরের জন্য জানিয়েছিল সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে। না, তাদের কেউ আসেনি কিট নিতে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এই কিট গ্রহণ করেছে সেই হস্তান্তর অনুষ্ঠানেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য সম্পর্কে গণমাধ্যম জানিয়েছে, যে কিট অনুমোদন পায়নি তা তারা গ্রহণ করবে কেন? অথচ গণমাধ্যম থেকেই জানা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার অনুমোদনহীন পরীক্ষা যন্ত্র ও কিট তারা আনতে গিয়েছিলেন আনুষ্ঠানিকভাবে। সে অনুযায়ী তাদের অনুমোদন বিষয়ক অজুহাতটি গ্রহণযোগ্য হতে পারার সঙ্গত কারণ নেই। তাছাড়া এই দুর্যোগের সময় অনুমোদন নিয়ে মাথা ঘামানোটাও মোটা মাথার কাজ।

এছাড়া গণস্বাস্থ্য তো পরীক্ষা ছাড়া তাদের কিট অনুমোদন দেয়ার কথা বলছে না। তারা বলছে সরকার পরীক্ষা করে দেখুক এটি কাজ করে কিনা, তারপর অনুমোদন দিক এবং সরকার নিজে তা ব্যবহার করুক। তারা তো ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য এটা তৈরি করেনি, করেছে মহামারি মোকাবেলায়। সরকারও যা চাচ্ছে। এ অবস্থায় যদি গণস্বাস্থ্যের কিটে দ্রুত পরীক্ষা করে মহামারির গতি-প্রকৃতি অনুধাবন করা যায়, তার থেকে ভালো আর কী হতে পারে!

এতে সরকারের সুবিধা হয় লকডাউন তুলে নেয়ার কর্মপন্থা নির্ধারণে। দেশ বাঁচতে পারে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে। গণস্বাস্থ্যের কিটের সুবিধা হলো এটা দিয়ে একেবারে উপজেলা পর্যায়ে সহজেই কোভিড আক্রান্তদের শনাক্ত করা যাবে। যেমন এখন ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায়। যদি তাই হয়, তবে এই কিট গ্রহণ বা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় এত গড়িমসি কেন? এতে ক্ষতিটা কার?

এই ক্ষতির প্রশ্নে অনেকে বলছেন, বর্তমানে ব্যবহৃত কিট বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এই আমদানির প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত, কাদের কাছ থেকে আনা হচ্ছে, কত দামে আনছে, প্রকৃত দাম কত, এসব খোঁজ খবর করলে সম্ভবত এই গড়িমসির একটা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। গণস্বাস্থ্যের কিট উৎপাদন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে এ অবধি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলে, যোগসূত্রের ব্যাপারটি কল্পনার ফানুস বলে মনে হবে না এটা নিশ্চিত।

তবে এর সঙ্গে অনেকে রাজনৈতিক যোগসূত্র খুঁজছেন। অনেকে বলার চেষ্টা করছেন, এই কিট দিয়ে পরীক্ষা শুরু হলে প্রচুর সংখ্যক আক্রান্ত শনাক্ত হবে। তখন চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর একটা চাপ পড়বে বলেই এই কিট নিয়ে ‘ধীর চলো’ নীতি নেয়া হয়েছে। এই কল্পনটা আমার কাছে কিছুটা অতিরঞ্জিত লেগেছে। কারণ হলো, আক্রান্তের সংখ্যা লুকালেও মৃত্যুর সংখ্যাটা লুকানো যাবে না।

মৃত্যুর ক্ষেত্রে জ্বর, সর্দি, কাশির কথা যেভাবে উদ্ধৃত হয়েছে, সেভাবেই উদ্ধৃত হবে। আর বিপুল সংখ্যক মৃত্যু এবং আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা লুকানোর বিষয়টিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত নয়। আর হলেও তা পরবর্তীতে সব দিক দিয়েই হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়াবে। এই দুর্ভোগের দায় সরকার কোনভাবেই নিতে চাইবে না। সরকার এখন দুটো বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে। এক. মহামারি। দুই. অর্থনৈতিক মন্দা। এমন অবস্থায় সরকার চাইবে দ্রুত অবস্থার উত্তরণ। আর এই উত্তরণের ক্ষেত্রে মহামারির গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ সবচেয়ে জরুরি। তাই সরকারের তরফ থেকে গণস্বাস্থ্যের কিট নিয়ে গড়িমসির যুক্তি খুব একটা ধোপে টিকে না। ধোপে যেটা টিকে সেটা হলো কিছু মানুষের কূটকৌশল।

কিছুদিন আগেও কেউ গলাবাজি করে বলেছেন, এ দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হবে না। কেউ কেউ বলেছেন, পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে। তাদের কথা যে পুরোটাই ফাঁকা বুলি ছিল তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। দেশের মানুষ বুঝে গিয়েছে তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হ-য-ব-র-ল অবস্থা। এই হ-য-ব-র-ল অবস্থার জন্য দায়ীরা চাইবে না তাদের বিপরীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সফল হোক।

গণস্বাস্থ্যের সফলতা মানে তাদের ব্যর্থতাকে আরও প্রকট করে তোলা। অতএব তারা সঙ্গতই চাইবে গণস্বাস্থ্য বিফল হোক। অন্তত যুক্তি তাই বলে। তবে সব যুক্তি বা হাইপোথিসিস ঠিক বা সফল হবে তেমন নয়। যেমন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের গণস্বাস্থ্যের কিট যে ব্যর্থ হবে তার আগাম হাইপোথিসিসের চেষ্টাও বিফল হতে পারে।

‘টকশো’র নামে টেলিভিশনটির একটি অনুষ্ঠানে আদালতের মত কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল গণস্বাস্থ্যের প্রধান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে। তার প্রতিপক্ষদের দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, কিটটি ভুলভাল রিপোর্ট দিতে পারে। ভালো কথা, মিডিয়া ট্রায়ালের কী দরকার, গণস্বাস্থ্য তো বলছেই সরকার পরীক্ষা করুক, পরীক্ষা করে অনুমোদন দিক। তার আগে সরকারকে আগাম ধারণা দেয়ার চেষ্টা কেন যে, কিটটি সঠিক নয়!

এই কিটটিকে যদি বিফল প্রমাণ করা যায়, তবে তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচেয়ে বেশি সরকার এবং এ দেশের মানুষ। এমন প্রচেষ্টা সরকার সর্বোপরি দেশের মানুষ অর্থাৎ সরকার ও রাষ্ট্রের বিপক্ষে। যে মুহূর্তে সরকারকে সহায়তা করা সবার দায়িত্ব এবং তা কেউ সরকার বিরোধী হলেও, সে সময় বিপদ উত্তরণের যে কোন সুযোগ হাতছাড়া করা হবে মহাবোকামি। এই বোকামির মাশুল গুনতে হবে শেষ পর্যন্ত সরকার এবং এ দেশের মানুষকেই।

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সূত্র​: দৈনিক যুগান্তর

Check Also

বরিশালের বিভিন্ন সড়কে ‘Sorry’ লেখা নিয়ে রহস্য!

বরিশাল নগরীর বেশ কয়েকটি সড়কে রঙ দিয়ে ইংরেজিতে ‘Sorry’ শব্দ লেখা নিয়ে ইতোমধ্যে রহস্যের সৃষ্টি …