দুই করোনাযোদ্ধা চিকিৎসকের গল্প

নেই কোনো ভ্যাকসিন কিংবা কার্যকরী ওষুধ। তবুও করোনাভাইরাস নামের অদৃশ্য এক প্রাণঘাতী ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে গোটা পৃথিবী। এই ভাইরাসে বহু মানুষের প্রাণহানি যেমন শঙ্কা বাড়িয়েছে, তেমনি কিছু মানুষের সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প আশা জাগিয়েছে মনে। জীবন বাজি রেখে দৃঢ় মনোবল নিয়ে করোনার বিরুদ্ধে ফ্রন্টলাইনে থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকলেও করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছেন নবীন চিকিৎসকরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় করোনাভাইরাস সংক্রান্ত বিষয়ে দেড়শ নবীন চিকিৎসক কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে দুই নবীন চিকিৎসক ও করোনাযোদ্ধা ডা. আকিব জাভেদ রাফি এবং ডা. তাসফিয়া আহমেদ।

পরিবারের সদস্যদের মায়া ত্যাগ করে রাত-দিন তারা কাজ করছেন দেশের তরে, মানবতার তরে। তবে এসব যোদ্ধাকে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মনে যতটা না ভয় কাজ করে, তারচেয়েও বেশি গর্ববোধ করেন তারা।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর আইসোলেশন সেন্টারে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রথম ধাপে যে কয়েকজন চিকিৎসকের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়, তাদের দুজন ডা. আকিব জাভেদ রাফি ও ডা. তাসফিয়া আহমেদ। তারা দুজনই বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ৩৯তম ব্যাচের স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা।

রাফি ও তাসফিয়া দুজনই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের মেড্ডা এলাকার বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের আইসোলেশন সেন্টারে দায়িত্ব পালন করছেন। ১১ এপ্রিল থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১০ দিন তারা আইসোলেশন সেন্টারে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের দেখভাল করেছেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক কিছু কাজও তাদের করতে হয়েছে। রোগীদের সঙ্গে সেখাইে তাদের খাওয়া-ঘুম সবকিছু হয়েছে। টানা দায়িত্ব পালনের পর তাদের করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে জেলা পরিষদ ডাক বাংলোতে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। নমুনার রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় সোমবার থেকে আবারও তারা আইসোলেশন সেন্টারে দায়িত্ব পালন করবেন।

রাফির বাড়ি কুমিল্লা জেলা শহরে। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর তার প্রথম পদায়ন হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার খড়িয়ালা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে রাফি মেজো। বড় বোন মেরিন তানজিনা আহমেদ চাকুরিজীবী আর ছোট বোন ছামিয়া ফেরদৌস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্রী। রাফির বাবা-মা দুজনেই শারীরিকভাবে অসুস্থ। বাবা জামসেদ উদ্দিন আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত, আর মা রোহেনারা বেগম ভুগছেন ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে।

রাফির স্ত্রী ডা. রুবানা জাহান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণে রয়েছেন। নিজেদের শারীরিক অসুস্থতায় ছেলেকে কাছে না পাওয়ার কোনো দুঃখ নেই রাফির বাবা-মায়ের মনে। ছেলে দেশের তরে কাজ করছেন, সেটিতেই গর্বে বুক ভরে উঠছে তাদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আইসোলেশন সেন্টারে দায়িত্ব পালনে প্রথম ব্যাচে ছেলেকে রাখায় খুশি তারা।

রাফির মা রোহেনারা বেগম বলেন, আমি ও আমার স্বামী দুইজনেই দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। আমাদের ইচ্ছে করে ছেলেকে কাছে রাখতে। কিন্তু দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে তো আমি আমার ছেলেকে ঘরে বসিয়ে রাখতে পারি না। আমি আরও উৎসাহ দিয়েছি। চিকিৎসক হিসেবে সে তার দায়িত্ব পালন করবে, এটাই স্বাভাবিক। ভয় নয়, আমার ছেলে মানুষের জন্য কাজ করছে ভেবে আমাদের অনেক গর্ব হয়।

ডা. আকিব জাভেদ রাফি বলেন, আমার বাবা-মা দুইজনেই অসুস্থ। এখন আমার তাদের পাশে থাকার কথা ছিল। কিন্তু চিকিৎসক হিসেবে দেশের ক্রান্তিলগ্নে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। দেশের সেবায়, দেশের মানুষের সেবায় আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমার অসুস্থ বাবা-মা, আমার স্ত্রী ও দুই বোন প্রতিনিয়ত আমাকে সাহস যোগাচ্ছেন। করোনাকে ভয় না করে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে তারা।

তিনি আরও বলেন, প্রথম ধাপে আমরা ছয়জন চিকিৎসক আইসোলেশন সেন্টারে দায়িত্ব পালন করেছি। রোগীদের ওষুধ খাওয়ানোসহ সেবা দেওয়ার পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সার্বক্ষণিক রোগীদের সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য সরবরাহ করতে হয়েছে আমাদের। রোগীদের নমুনাও সংগ্রহ করতে হয়েছে। করোনা আক্রান্ত মানুষের সেবা করতে গিয়ে আমি মারা গেলেও কোনো দুঃখ থাকবে না।

আরেক করোনাযোদ্ধা তাসফিয়ার বাড়ি যশোরের শার্শা উপজেলায়। তবে বর্তমানে তার পরিবার ঢাকার আদাবর এলাকায় বসবাস করে। তাসফিয়ার বাবা তৈয়ব উদ্দিন আহমেদ মুক্তিযোদ্ধা। তিনি দীর্ঘদিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। মা সুফিয়া বেগম গৃহিনী। একমাত্র ভাই সাফায়েত আহমেদ ফার্মাসিস্ট। তাসফিয়ার স্বামী ওয়াসিম আকরাম সেনাবাহিনীর মেজর।

তাসফিয়া বিসিএস-এ উত্তীর্ণ হওয়ার পর সরকারি চাকরির প্রথম পদায়ন হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউয়িন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। শ্বশুরবাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে হওয়ায় পদায়ন পেয়ে খুশিই হন তিনি। চাকরির বছর যেতে না যেতেই দেশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাসফিয়াকে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে ভয় নয়, ১৫ মাস বয়সী একমাত্র সন্তান নিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। তবে পরিবারের পূর্ণ সহযোগিতায় সব বাধা পেরিয়ে তাসফিয়া নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেছেন করোনাযুদ্ধে।

তাসফিয়ার পরিবারও তার এই কাজে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। দেশের জন্য কাজ করা করোনাযোদ্ধা মেয়ের জন্য এখন গর্ব হয় তাদের।

তাসফিয়ার বাবা তৈয়ব উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি ১৮ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছি। আর আমার মেয়ে ২৬ বছর বয়সে করোনাযুদ্ধে রয়েছে। আমরা যেমন মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছিলাম, তেমনি আমার মেয়েসহ চিকিৎসকরা করোনা বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে জয়ী হবে বলে বিশ্বাস করি। আমরা যেহেতু দূরে থাকি, তাই প্রথমে একটু ভয় লাগত; কিন্তু মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে যেভাবে সহযোগিতা করছে, তাতে ভয়টা কেটে গেছে। সন্তানের জন্য আমরা গর্ববোধ করি।

ডা. তাসফিয়া আহমেদ বলেন, চাকরিতে ঢুকেই এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেটির জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তবে আমরা সবসময় মানুষকে সেবা দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আইসোলেশন সেন্টারে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসায় দায়িত্ব পালনকারীদের তালিকায় আমার নাম দেখে প্রথমে কিছুটা অবাক হয়েছিলাম। কারণ ছোট বাচ্চা থাকায় দায়িত্ব পালন করা আমার জন্য সমস্যা ছিল। স্বামীও এখানে থাকেন না; তাই ছোট বাচ্চাকে রেখে কীভাবে দায়িত্ব পালন করব, তা নিয়ে চিন্তা হচ্ছিল। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। বাবা-মা আমাকে সাহস দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ঊর্ধ্বতনরাও নিয়মিত খেঁজ-খবর নিচ্ছেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছেন। সেজন্য এখন আর ভয় লাগে না।

বয়সে এবং চাকরিতে নবীন চিকিৎসকরা যেভাবে করোনাভাইরাসে দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে নিজেদের সঁপে দিয়েছেন, সেটি ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তাদের ঊর্ধ্বতনরা। তারাও নবীন এসব চিকিৎসককে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ব্রাহ্মণাবড়িয়া জেলায় দেড়’শ নবীন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছাড়াই দৃঢ় মনোবল নিয়ে তারা প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। আমরা তাদেরকে সবধরনের সহযোগিতা করছি। সবসময় তাদের মনোবল চাঙা রাখার চেষ্টা করছি। আশা করি সবাই মিলে এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পারবো।

Check Also

নারায়ণগঞ্জে ট্রেন থামিয়ে ঝালমুড়ি কিনলেন চালক (ভিডিও)

মাঝপথে ট্রেন থামিয়ে ঝালমুড়ি কিনছেন নারায়ণগঞ্জের এক ট্রেনচালক। তার এ ঝালমুড়ি কেনার ভিডিও এখন সামাজিক …