আসুন বলি ডা. ফেরদৌস অভিবাদন, আমরা ভুল করেছি ক্ষমাপ্রার্থী

খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)

কবি হাসান হাফিজুর রহমান বলেছিলেন, ‘এ দেশে বীর নেই শহীদ আছে’। আসলেও আমরা বীরের মর্যাদা জীবিতকালে দিতে পারি না। মৃত্যুতে গুণগান করি।করোনার মহাপ্রলয়ে যখন পৃথিবী লন্ডভন্ড, জীবিকার লড়াই যখন কঠিন হয়ে পড়েছে, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে মানবজাতি তখনও আমরা অনেকে নিজের মনের কালিমা মুছতে পারছি না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন মহাবিপর্যয় কালেও লাশের ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ আসামির গলায় হাঁটু চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা, বর্ণবাদের হিংস্রতার দানবিক চেহরা উন্মোচিত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। জর্জ ওয়াশিংটনকে বলা হয় আমেরিকার স্বাধীনতার জনক। আব্রাহাম লিংকনকে গণতন্ত্রের জনক আর মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে বলা হয় বর্ণবাদ বিরোধী মানবতার জনক। সেদিন মার্টিন লুথার কিংয়ের আত্মা কেঁদেছে, যে আদর্শে বিপ্লবে সকল নাগরিকের সম অধিকার জয় করেছিলো আমেরিকা তা ধুলোয় গড়িয়েছে। জগৎবিখ্যাত মহান নেতাদের আদর্শ মানবতার আদর্শ। সীমান্তে তারা বাঁধা থাকেন না। মানবজাতির পথ প্রদর্শক হন। কিন্তু সকল মানবতাবাদীর পথের নির্দেশনা ভুলে করোনাকালে ও আমরা অনেকেই হিংসা আক্রোশ মুক্ত হতে পারছি না।

পৃথিবীজুড়েই বর্ণবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষ মনে ও চিন্তায় নানাভাবে পুষি আমরা অনেকে, যা মানবিক সমাজের জন্য ভয়ংকর। যা কখনো শান্তি আনতে দেয় না। যাক এসব এখন নয়। এখন করোনার বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াই। মৃত্যুর সাথে জীবনের লড়াই। করোনার থাবায় ৪ লাখের বেশি মানুষের জীবন নিভে গেছে। পৃথিবী এমন মহামারি, মর্মান্তিক মৃত্যু আগে কখনো দেখেনি। দুনিয়ায় এখন ৭০ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত। মারা গেছেন চার লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষ। গেল বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহানে যার তান্ডব পৃথিবীতে এখন সে ত্রাস। মানবজাতি সর্বশক্তি দিয়ে লড়েও তাকে পরাস্ত করতে পারেনি। চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রেই সবচেয়ে আক্রান্ত ও মৃতের পরিমাণ। পৃথিবীর দিনরাত জেগে থাকা ঝলমলে বাণিজ্যিক নগরী করোনাকালে ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়। মৃত্যুর বিভীষিকা আতংক নিউইয়র্কের মানুষই দেখেনি, তাবৎ দুনিয়ার মানুষকে ভীত সন্ত্রস্ত করেছে। সেই কঠিন অন্ধকার মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে প্রবাসী চিকিৎসক বা মেডিসিনের ডাক্তার খন্দকার ফেরদৌস করোনা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লড়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদেরই পরম আশ্রয় ভরসা বিশ্বাসের শক্তি হয়ে উঠেননি সেখানকার সকল নাগরিককে জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সেবা দিয়েছেন। ওর চেয়ে বড় ইবাদত আর কি হতে পারে? সেই সাথে মন পড়ে থাকা প্রিয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য টেলিভিশনের লাইভে, নিজের ফেসবুক লাইভে নির্দেশনা দিয়েছেন। নিউইয়র্কের প্রলয় থামতেই, মৃত্যুহীন সকাল নিউইয়র্কে উঠতেই বাংলাদেশের সন্তান খন্দকার ফেরদৌস আকাশে উড়েছেন দেশে আসতে। ততদিনে তিনি দেশের গর্ব হয়ে গেছেন। মানুষও খুশি। কিন্তু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের নব্বই দশকের ছাত্রটি আকাশে থাকতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে যায়, তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনি মীরজাফর খ্যাত কুখ্যাত খন্দকার মোশতাক আহমেদের ভাতিজা ও ঘাতক রশীদের খালাতো ভাই! যাচাই বাছাই ছাড়াই সবাই ছড়িয়ে দিলেন। ডাক্তার ফেরদৌস যখন নামলেন তখন তার মন বিষন্ন। বিষাদগ্রস্ত হৃদয়ে অপমানে লজ্জায় তিনি একটা স্ট্যাটাস দিলেন তার ফেসবুকে। সেই স্ট্যাটাস ছিলো এমন-

ভালো থেকো বাংলাদেশ:

‘দেশে আসার জন্য যখন এয়ারক্রফটে চড়ে বসি তখনও ভাবিনি, আমার জন্য এতো লজ্জাজনক তিক্ত অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে। যা দেশের মানুষের কাছ থেকে আমার প্রাপ্য ছিল না। এমন কোনো অন্যায়,অপরাধ আমি করিনি। আমি দেশের মন্ত্রী এমপি কিংবা উচ্চপদে আসীন হতে চাইনি। কোভিড-১৯ নিয়ে গত তিনমাস যুক্তরাষ্ট্রে অমানুষিক পরিশ্রম করেছি। দেশেও এসেছি দেশের মানুষের কোনো কাজে নিজেকে লাগানো যায় কিনা সেই উদ্দেশ্য নিয়ে। কেউ আমার সেবা না চাইলে আমি আবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাবো। আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ। এই দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আমি ডাক্তার হয়েছি। দায়িত্ববোধ থেকেই বার বার দেশে আসি। মানুষের জন্য কাজ করি। কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে আসি না। এই দেশ থেকে ডাক্তারি পাশ করে বিদেশ গিয়ে ৯০ শতাংশই দেশে আসেন না। আমার অপরাধ আমি দেশে বার বার আসি। প্লেন থেকে নেমেই জানলাম আমাকে বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোশতাকের ভাতিজা উপাধি দেয়া হয়েছে। আরেক খুনি রশিদের খালাতো ভাই বানানো হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, আমি নাকি পলাতক তারেক রহমানকে নিয়মিত টাকা পয়সা দেই।

ডা. ফেরদৌস

এইসব নিয়ে আসলেই আমি বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমার বাড়ি কুমিল্লা, নামের সাথে খন্দকার আছে। তাই হয়তো মোস্তাক-রশিদ গংদের আত্মীয় উপাধি দেয়া হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া হলে হয়তো গোলাম আযমের আত্মীয় বানানো হতো। গোপালগঞ্জ বাড়ি হলে হয়তো বলতো আমি মুফতি হান্নানের আত্মীয়। যারা এইসব অপবাদ দিচ্ছেন জানিনা তাদের আমি কি ক্ষতি করেছি। আমি যা না আমারে তা বানিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু আমি যা ছিলাম তা বলছেন না কেন আপনারা?

১৯৯১ সালের পর চট্টগ্রাম মেডিকেলে শিবির ছাত্রদলের তোপের মুখে ছাত্রলীগের শ্লোগান দিয়েছি। শিবিরের মা’র খেয়ে ক্যাম্পাসও ছাড়তে হয়েছিল। শিবিরের সাথে যুদ্ধ করে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগকে পুনর্প্রতিষ্ঠিতও করেছি। এই বিষয়ে তথ্য নেয়া খুব সহজ। আপনারা চাইলেই খবর নিতে পারেন। আমরা যখন শিবিরের বিরুদ্ধে ফাইট করেছি তখন আজকের সমালোচকরা কই ছিলেন আমার জানা নাই। বেশি কথা বলতে চাই না। আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম। আমার সম্পর্কে যদি এই অপবাদের একটাও প্রমাণ করতে পারে তাহলে যে শাস্তি দিবে আমি তা মাথা পেতে নেবো। আর যারা অপবাদ দিচ্ছেন তাদের প্রতি কোনো অনুরোধ কিংবা অভিযোগ নাই। শুধু এই টুকু বলবো, নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। আমার সম্মানহানির এই অপচেষ্টার জন্য রোজ হাশরের ময়দানে আপনাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে। নিয়তির বিচার অনেক কঠিন। এটা কাউকেই ছাড়বে না।’

এখন ডাক্তার ফেরদৌসের বক্তব্য যদি সত্য হয়, যারা অভিযোগ ছড়িয়েছিলেন তারা যদি তার চ্যালেঞ্জ নিতে না পারেন তাহলে কি অন্তত বিবেকের তাড়নায় এমন মানবিক যোদ্ধার বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্য নিজেদের ফেসবুকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইবেন? লজ্জা গ্লানি অনুশোচনায় অঙ্গীকার করবেন আর কারও বিরুদ্ধে এমন মিথ্যাচার চরিত্রহননের অপচেষ্টা কখনো করবেন না? দেশের জনগণের টাকায় কত সন্তান লেখাপড়া করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন নিরাপদ জীবনযাপন করছেন। কতজন দেশের দুঃসময়ে ভূমিকা রাখেন? তবুতো তারা আমাদেরই স্বজন। যে মানুষটি দেশের গৌরব নিয়ে সেবা দিতে এলো, ঋণ শোধের তাড়নায়, তাকে এভাবে কলংকিত কেনো?

বাংলাদেশের মানুষকে সেবা দিতেইতো নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকার রোববার বিকালে কাতার এয়ারওয়েজের চার্টার্ড ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে কোয়ারেন্টিনে নিয়ে যায়। তিনি সঙ্গে নিয়ে এসেছেন করোনাভাইরাসে সম্মুখসারির যোদ্ধাদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী। নিউইয়র্কে দিনরাত লড়ে ক্লান্তি ভুলে দেশের টানে, মানুষের জন্য মানুষের ডাক্তার খন্দকার ফেরদৌস এলেন বিনা পয়সায় সেবা দিতে। নিজের জীবনের ঝুঁকি তখন নিলেন যখন বিদেশিরাতো বটেই দেশের শিল্পপতিরাও ভয়ে দেশ ছেড়েছেন। ফেরদৌস তখনই এলেন যখন আমরা করোনার ভয়াল থাবায় আক্রান্ত। নিজের পরিবার সন্তানদের রেখে এলেন ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকার কষ্ট জেনে। আমরা কোথায় তাকে ফুলে ফুলে করতালিতে অভিবাদন জানাবো, তা না তাকে ছোট করতে গিয়ে নিজেরাই ছোট হয়েছি। করোনার যুদ্ধ মানবজাতির অস্তিত্বের যুদ্ধ। করোনার সাথেই বসবাস করতে হবে আমাদের। বড় দুঃসময় এখন। এখন সবার মিলে বাঁচার সময়। লড়বার সময়। পাশে দাঁড়াবার সময়। ওষুধ ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। টানেলের শেষ প্রান্তে আলো দেখার লড়াই করছেন। আবিষ্কার হলেও পেতে অনেক সময়। চারদিকে আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংবাদ। ভয় আতংক দুর্বল চিকিৎসাসেবা। ডাক্তার ফেরদৌসতো মানুষই নয়, চিকিৎসকদেরও মনোবল বাড়াবেন। তার বক্তব্য সত্য হলে, চ্যালেঞ্জ নিতে না পারলে, আসুন আমাদের সন্তান ডাক্তার ফেরদৌসকে অভিবাদন জানিয়ে বলি, ভুল হয়েছে, ক্ষমাপ্রার্থী। তার বক্তব্য সত্য হলে নিশ্চিত, ব্যর্থ ঈর্ষাপরায়নরা মানসিক বিকৃতি ও পরাজয়ের গ্লানিতেই এমন মিথ্যাচার করেছে। অনেকে মেডিকেলে পড়াকালীন ছাত্রলীগের মিছিলে সভায় সক্রিয় থাকার ছবি দিয়েও সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সেই সময়ের সভাপতি ডা. মো. সেলিম বলেছেন, ডা. ফেরদৌস খন্দকার ছাত্রলীগের সাথে শুধু যুক্ত ছিলেন না, ছিলেন নিবেদিত প্রাণ নির্যাতিত কর্মী। হল থেকে বিতাড়িত হয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা চট্টগ্রামের অলিগলিতে ভাড়া থাকতেন। দামপাড়ায় এমনই এক মেসে থাকতেন তিনি। পাশের রুমে ছিলেন ডা. মো. সেলিম। চমেক ছাত্রলীগের তখনকার সভাপতি। ৯১-৯৬ চমেক ছাত্রলীগের সাধারণ কর্মী হওয়া সাধারণ ছিল না। বিশেষ করে ৯৩’র ট্রিপল মার্ডারের ছাত্রলীগের ওপর পাশবিক অত্যাচার হয়েছিল। সে সময় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের কর্মীই আজকে ডা. ফেরদৌস খন্দকার।

লেখক: সম্পাদক, পূর্বপশ্চিম

Check Also

বরিশালের বিভিন্ন সড়কে ‘Sorry’ লেখা নিয়ে রহস্য!

বরিশাল নগরীর বেশ কয়েকটি সড়কে রঙ দিয়ে ইংরেজিতে ‘Sorry’ শব্দ লেখা নিয়ে ইতোমধ্যে রহস্যের সৃষ্টি …