তেলাপোকা সমস্যা ও নিয়ন্ত্রণ

তেলাপোকা আমাদের বাসা-বাড়ির অন্যতম ক্ষতিকর একটি পতঙ্গ। এদের কারণে বিরক্ত নন, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অনেকেই তেলাপোকা নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রয়েছেন। একজন কীটতত্ত্ববিদ হিসেবে অনেকেই আমার কাছে জানতে চান, তেলাপোকাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তাই সবার উদ্দেশে আমার এই লেখা।

কথায় আছে, ‘অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’ কথাটি পুরোপুরি সত্য। প্রাচীন প্রাণীর মধ্যে তেলাপোকা অন্যতম পতঙ্গ, ৩২০ মিলিয়ন বছর আগে কার্বনিফেরাস যুগে এদের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তখন থেকে শুরু করে দুর্দান্ত প্রতাপ নিয়ে পৃথিবীতে বিভিন্ন জায়গায় তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে এই পতঙ্গ। পৃথিবীতে ৪,৬০০ প্রজাতির তেলাপোকা রয়েছে, তার মধ্যে ৩০ প্রজাতি মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশে আমরা পাঁচ প্রজাতির তেলাপোকাকে সচরাচর দেখে থাকি। জার্মান, আমেরিকান, অরিয়ান্টাল, স্মোকি ব্রাউন, ব্রাউন ব্যান্ডেড ইত্যাদি।

তেলাপোকা নিশাচর প্রাণী, এরা রাতে ঘোরাফেরা করতে পছন্দ করে। দিনের বেলায় অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায়ও এদের দেখা যায়। তেলাপোকা নোংরা-স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় থাকে বলে এরা বিভিন্ন ধরনের রোগ ছড়াতে সক্ষম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, তেলাপোকা ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, যক্ষ্মা, প্লেগ, টাইফয়েড এবং বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ ছড়ায়। তেলাপোকা কিছু কিছু মানুষের অ্যালার্জিক রি-অ্যাকশন ঘটায়। বিশেষ করে অ্যাজমা রোগীদের জন্য তেলাপোকা খুবই ক্ষতিকর।

বর্তমানে বাংলাদেশে তেলাপোকার যে প্রজাতিটি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে, সেটি হচ্ছে জার্মান তেলাপোকা। এটি দেখতে হালকা বাদামি রঙের ও ছোট আকৃতির। একটি পূর্ণাঙ্গ তেলাপোকার দৈর্ঘ্য আধা ইঞ্চির বেশি হয় না। বাজারের ব্যাগ, জিনিসপত্র বা খাবারের কার্টুন, আসবাবপত্রের মাধ্যমে এরা বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করে। এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বাসা-বাড়ি, হাসপাতাল এবং অফিস-ঘরে। এরা ঘরের ভেতরে থাকতে পছন্দ করে এবং দ্রুত বংশ বিস্তার করতে সক্ষম। একটি মা তেলাপোকা এক বছরের কম সময়ে এক হাজারেরও বেশি বাচ্চা উৎপাদনে সক্ষম বলে এদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। রান্নাঘর, বাথরুমের উষ্ণ, আর্দ্র, অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় এরা লুকিয়ে থাকে। সংখ্যায় বেড়ে গেলে আলমারির কাপড়-চোপড় এবং বিছানার নিচে এদের দেখতে পাওয়া যায়।

আমরা সচরাচর বড় আকৃতির লালচে-বাদামি যে তেলাপোকাটি দেখতে পাই, সেটি হচ্ছে আমেরিকান তেলাপোকা। একটি পূর্ণাঙ্গ আমেরিকান তেলাপোকা দৈর্ঘ্যে এক ইঞ্চি বা তার অধিক হয়ে থাকে। এরা ড্রেন, নর্দমা এরিয়া, টানেল এবং পাইপের ভেতর থাকতে পছন্দ করে। রাতে এরা বাথরুম ও রান্নাঘরের পাইপ বেয়ে উপরে উঠে আসে।

নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা :

তেলাপোকা নিয়ন্ত্রণ সহজসাধ্য কাজ নয়। তার পরেও সঠিক নিয়ম অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করলে এদের দমন করা যায়।

বাসায় ব্যবহৃত উপাদান দিয়ে নিয়ন্ত্রণ : বাসায় ব্যবহৃত উপাদান যেমন সোডিয়াম বাই কার্বনেট (বেকিং সোডা), বোরিক এসিড দিয়ে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বেকিং সোডা বা বোরিক এসিড রাতে বাথরুম ও রান্নাঘরের কেবিনেটের কোনায়, রান্নাঘর এবং বাথরুমের ওয়াল, ফ্লোর, কর্নার, রেফ্রিজারেটর ও অন্যান্য ফার্নিচারের পেছনে ছিটিয়ে দিলে তেলাপোকা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ ছাড়া এদের তাড়ানোর জন্য প্রাচীনকাল থেকে নানা ধরনের পদ্ধতি পৃথিবীব্যাপী ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শসা, হলুদ, পোলাও পাতা, বিভিন্ন ধরনের তেল যেমন ইউক্যালিপটাস, মিন্ট ইত্যাদি ঘরে রেখে দিলে তেলাপোকা দূরে সরে যায়। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে গাড়িতে সুঘ্রাণ এবং তেলাপোকা দমনের জন্য পোলাও পাতা ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

বিষ ফাঁদ :

হাইড্রোমিথাইলনন, ফিপ্রনিল, বোরিক এসিড খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে তেলাপোকা চলাচলের স্থানে দিয়ে তেলাপোকা মারা যায়।

জীবজ নিয়ন্ত্রণ : কিছু কিছু প্রাণী দিয়ে তেলাপোকাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যেমন প্যারাসাইটডিয়াল ওয়াস্প (Ampulex) তেলাপোকাকে ধ্বংস করে।

কীটনাশক বা রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ :

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত বেশ কিছু কীটনাশক পৃথিবীতে তেলাপোকা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর মধ্যে অনেকই বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া যায়। পৃথিবীব্যাপী তেলাপোকা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কীটনাশক হচ্ছে আলফা সাইপারমেথ্রিন, বেনডিওকারব, ক্লোরোপাইরিফস, ডেল্টামেথ্রিন, ফেনিট্রথিয়ন, ম্যালাথিয়ন, প্রপকজর, পিরিমিফসমিথাইল ইত্যাদি। তেলাপোকার বৃদ্ধিকে রোধ করার জন্য ফ্লুফেনোজুরন নামে একটি কীটনাশক পৃথিবীব্যাপী ব্যবহার হয়ে থাকে।

তেলাপোকা থেকে মুক্ত থাকার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো রান্নাঘর, বাথরুম এবং বাসা-বাড়ি আলোকোজ্জ্বল, শুকনো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।

লেখক : কীটতত্ত্ববিদ, অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Check Also

ফ্রিজে অতিরিক্ত বরফ জমছে, জেনে নিন করণীয়

অনেকের ফ্রিজে কয়েকদিন পর পরই বরফের আস্তরণ পড়ে যায়। সেটা নরমালেই হোক বা ডিপ। বরফের …