নীনার সঙ্গে প্রেম, শ্লীলতাহানির অভিযোগে একঘরে হন আলোকনাথ


পর্দায় তিনি ভালো মানুষ। সংস্কারের জয়ধ্বজা থাকে তার হাতেই। অথচ সেই আলোকনাথের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগে শোরগোল তীব্র। শোনা যায়, সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনয় করা এই বর্ষীয়ান অভিনেতার রিল এবং রিয়েল লাইফের মধ্যে নাকি আকাশপাতাল পার্থক্য।

পাঁচশোর বেশি সিনেমা এবং প্রায় সত্তরটি টিভি সিরিয়ালে কাজ করেছেন আলোকনাথ। সব চিত্রনাট্যেই তাকে দেখা গিয়েছে প্রায় একই ভূমিকায়। সংসারের ‘সংস্কারী বাবা’। যেখানে বেশির ভাগ কুশীলব টাইপকাস্ট হতে ভয় পান, সেখানে আলোকনাথ দ্বিধা করেননি একই ভূমিকায় অভিনয় করতে।

তার পুরো নাম আলোকনাথ ঝা। বিহারের খাগারিয়ায় আলোকনাথের জন্ম ১৯৫৬’র ১০ জুলাই। তবে তার বড় হওয়া দিল্লিতে। সেখানে মডার্ন স্কুলের পরে পড়াশোনা হিন্দু কলেজে। কলেজ পড়ার সময় থেকেই তার আগ্রহ থিয়েটারে।

এরপর তিনি ভর্তি হন ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায়। সেখানে তার সহপাঠী ছিলেন নীনা গুপ্ত এবং অনু কাপুর। সতীশ কৌশিক, অনুপম খের এবং পঙ্কজ কাপুরের মতো অভিনেতা তার সিনিয়র ছিলেন।

ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে সদ্য উত্তীর্ণ আলোক নাথ মুম্বইয়ে এসেছিলেন ১৯৮০ তে। সে সময় পৃথ্বী থিয়েটারে অনেক নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সেখানেই ইন্ডাস্ট্রির নজরে পড়েন তিনি। ছবিতে প্রথম অভিনয় ১৯৮২ সালে, ‘গাঁধী’তে।

কেরিয়ারের প্রথম ছবিতে আলোকনাথ কিন্তু বাবার চরিত্রে অভিনয় করেননি। তার অভিনীত চরিত্র তয়েব মহম্মদের বৈশিষ্ট্য ছিল কথায় কথায় রেগে যাওয়া। সেই ছবিতে ছিলেন নীনা গুপ্তও। কলেজজীবন থেকেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

এরপর আরও কিছু ছবিতে ছোটখাটো ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিনি। তবে পরিচিতি পান ছোট পর্দা থেকে। সে সময় রমেশ সিপ্পি একটি ধারাবাহিক তৈরি করছিলেন। নাম, ‘বুনিয়াদ’। ভারতীয় দূরদর্শনের ইতিহাসে মাইলফলক ধারাবাহিক। সেখানে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন আলোকনাথ।

আশির দশকে আলোকনাথ যখন ৩৪ বছর বয়সি যুবক, তিনি ‘বুনিয়াদ’তে অভিনয় করেছিলেন অশীতিপর বৃদ্ধের ভূমিকায়। ধারাবাহিকে আলোকনাথের অভিনীত চরিত্রের নাম ছিল ‘হাভেলিরাম’। তার স্ত্রীর ভূমিকায় ছিলেন অনিতা কনওয়ার। পরবর্তী সময়ে পর্দার বাইরেও তার স্ত্রী হন অনিতা।

নীনা গুপ্তর সঙ্গে প্রেম ভেঙে যাওয়ার পরে অনিতাকেই বিয়ে করেন আলোকনাথ। ‘বুনিয়াদ’র দৌলতে আলোকনাথের ‘বৃদ্ধ’ চেহারা দর্শকদের খুব পছন্দ হয়। কিন্তু আলোকনাথ তো বাবার ভূমিকায় অভিনয় করতে আসেননি। তার ইচ্ছে ছিল নায়ক হওয়ার। নায়ক হয়েওছিলেন।

‘কামাগ্নি’ ছবিতে টিনা মুনিমের বিপরীতে। কার্যত ‘বি গ্রেড’র তকমা পাওয়া এই ছবিতে বহু সাহসী, খোলামেলা দৃশ্য ছিল। ১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কামাগ্নি’ ছিল সেই সময়ের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু বক্স অফিসে এই ছবি মুখ থুবড়ে পড়ে। সেইসঙ্গে আলোকনাথের নায়ক হওয়ার স্বপ্নও। এরপর তার কাছে ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবির অফার আসে।

বক্স অফিসে ছবিটি সুপারডুপার হিট হয়। এই ছবির সুবাদে বলিউডে আলোকনাথ পরিচিত হয়ে যান নায়ক বা নায়িকার বাবা হিসেবেই। এর পর তিনি অভিনয় করেন ‘ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া’ ছবিতে।

নায়ক নায়িকার পাশাপাশি চিত্রনাট্যে দর্শকদের কুর্নিশ আদায় করে নিতেন আলোকনাথও। স্বাদ বদলানোর জন্য তিনি অভিনয় করেছেন খলনায়কের চরিত্রেও। ‘বোল রাধা বোল’ এবং ‘বিনাশক’ ছবিতে তাকে দেখা গিয়েছে নেগেটিভ ভূমিকাতে। কিন্তু নায়ক নায়িকার বাবা হিসেবে যে সুনাম তিনি পেয়েছেন, তা খলনায়ক হিসেবে পাননি।

ফলে একটা সময়ে অলোকনাথ স্থায়ী হয়ে যান স্নেহময় বাবার চরিত্রেই। কোনও রকম পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়াই এগোতে থাকে কেরিয়ার। তবে ভাটা পড়েনি জনপ্রিয়তা এবং ছবির অফারে।

তারকা আলোকনাথের কাছেই আসে ‘তারা’ সিরিয়ালে অভিনয়ের প্রস্তাব। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত টানা চার বছর এই ধারাবাহিক ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। শীর্ষ চরিত্র ‘তারা’র ভূমিকায় ছিলেন নভনীত নিশান। আলোকনাথের চরিত্রের নাম ছিল দীপক শেঠ। নভনীত সে সময় আলোকনাথের বিরুদ্ধে অশালীনতার অভিযোগ এনেছিলেন। তার অভিযোগ ছিল, মত্ত অবস্থায় আলোকনাথ অশ্লীল আচরণ করেন।

নভনীতের অভিযোগের ভিত্তিতে আলোক নাথকে সিরিয়াল থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু এর ফলে ধারাবাহিকের টিআরপি দ্রুত হারে পড়তে থাকে। শেষে সিরিয়ালের চিত্রনাট্যে পরিবর্তন আনা হয়। সেইসঙ্গে ফিরিয়ে আনা হয় আলোকনাথকেও। এর জেরে ক্ষুব্ধ নভনীতই সিরিয়াল ছেড়ে বেরিয়ে যান।

‘তারা’র অন্যতম কাহিনিকার ছিলেন বিনতা নন্দা। তিনি ছিলেন আলোকনাথের স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। তার সঙ্গেও আলোকনাথের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আলোকনাথের স্ত্রী অনিতার সঙ্গে বিনতার সম্পর্ক অটুট ছিল। বান্ধবীর আমন্ত্রণে এক বার তাদের বাড়ির পার্টিতে গিয়েছিলেন বিনতা।

বিনতার অভিযোগ, পার্টি থেকে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। নির্জন রাস্তায় হেঁটে একাই ফিরছিলেন বিনতা। সে সময় নাকি আলোকনাথ গাড়ি নিয়ে এসে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চান। গাড়িতে তার পাশে বসার পরে বিনতাকে নাকি আরও মদ্যপান করান আলোক নাথ।

কাহিনিকারের অভিযোগ, ওই অবস্থায় বাড়িতে পৌঁছানোর পরে তার আর কিছুই মনে নেই। তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। পরের দিন বিকেলে যখন ঘুম ভাঙে তার দেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। বিনতার অভিযোগ, মাদক মেশানো মদ পান করানোর ফলে তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন। সেই সুযোগে আলোকনাথ তার শ্লীলতাহানি করে বলে অভিযোগ বিনতার।

সে সময় আলোকনাথের বিরুদ্ধে অনেকের কাছে অভিযোগ করেন বিনতা। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। আলোকনাথের মতো তারকার বিরুদ্ধে যেতে কেউ রাজি হননি। বরং এর জেরে বিনতাই কাজ কম পেতে থাকেন। কিন্তু আলোকনাথের কেরিয়ারে কোনও ক্ষতি হয়নি।

রাজশ্রী প্রোডাকশনের প্রায় সব ছবিতে আলোকনাথের ভূমিকা ছিল বাঁধা। কিন্তু এই প্রযোজক সংস্থার এক কস্টিউম ডিজাইনারও অভিনেতার বিরুদ্ধে অশালীন আচরণের অভিযোগ আনেন। তার পরেও আলোকনাথের সুনাম কালিমালিপ্ত হয়নি। বরং তিনি সিনেমা ও সিরিয়াল, দু’টি মাধ্যমেই দাপটের সঙ্গে অভিনয় করতে থাকেন।

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও আলোকনাথ ছিলেন চরম জনপ্রিয়। তাকে নিয়ে তৈরি মিম-ও উপভোগ করতেন তিনি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াই এক সময় ভরাডুবি ডেকে আনল তার কেরিয়ারে। সে সময় শুরু হল ‘মি টু’ মুভমেন্ট। একের পর এক বলিউড অভিনেতা-পরিচালক-প্রযোজকের বিরুদ্ধে উঠতে লাগল অভিযোগ। ভাবমূর্তি হারিয়ে তাদের কাজও কমতে লাগল।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হল আলোকনাথকেও। তার বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগ নতুন করে আনলেন বিনতা নন্দা। আগে যতটাই উপেক্ষিত ছিলেন, মি-টু স্রোতে ততটাই গুরুত্ব পেলেন তিনি।

সেই প্রসঙ্গে এল নভনীত নিশানের পুরোনো অভিযোগও। সন্ধ্যা মৃদুলও অভিযোগ করলেন, একটি শর্ট ফিল্মে কাজ করার সময় তার সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছিলেন আলোকনাথ। অভিনেত্রী হিমানী শিবপুরী এবং দীপিকা আমিনও মুখ খোলেন আলোকনাথের বিরুদ্ধে।

পর্দায় আলোকনাথের মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করা ভাগ্যশ্রী বলেন, তার সঙ্গে অভিনেতা কোনও দিন অশালীন ব্যবহার করেননি। কিন্তু তিনি লক্ষ করেছিলেন, মদ্যপান করার পরে আলোকনাথের আচরণের আমূল পরিবর্তন হয়।

তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন আলোকনাথ। আলোকনাথের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন বিনতা নন্দা। এই মর্মে আলোকনাথ যা বলেন, তাতে সব অভিযোগই ঘুরে যায় বিনতার দিকেই।

আলোকনাথের বক্তব্য ছিল, ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় সহপাঠী বিনতার দুর্বলতা ছিল তার উপর। কিন্তু তিনি তাকে বিয়ে না করায় বিনতার অনুভূতি থেকে যায় একতরফা প্রেম হয়েই।

কিন্তু এই সাফাই দেওয়ার পরেও শেষরক্ষা হয়নি। ইন্ডাস্ট্রিতে আলোকনাথ একঘরে হয়ে যান। সে সময় ‘মি টু’ বিষয় নিয়েই একটি ছবিতে অভিনয় করছিলেন আলোকনাথ। সেই ছবি মাঝপথেই আটকে যায়। ওই একই সময়ে অজয় দেবগণের ছবি ‘দে দে প্যায়ার দে’ ছবিতেও অভিনয় করেন আলোকনাথ।

দর্শকরা এই ছবি থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেন। এরপর থেকে আলোকনাথ নিজের হারানো জনপ্রিয়তা আর ফিরে পাননি। সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা।

Check Also

‘এ কেমন খেলা’য় মেতেছেন ইরফান-তিশা?

সাইকো থ্রিলার গল্পের একটি নাটকে জুটি বেঁধেছেন ছোট পর্দার অভিনেতা ইরফান সাজ্জাদ ও তাসনুভা তিশা। …