বলিউডে কুপ্রস্তাবের শিকার তারা

নারীরা সব ক্ষেত্রে অনিরাপদ, উন্মুক্ত বিশ্বায়নের যুগে এসেও নারীরা চাকরি, পড়াশোনা, মিডিয়ায় যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে বিশ্ব চলচ্চিত্রপাড়ায় যৌন হেনস্তার বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন অভিনেত্রীরা।

মিডিয়ায় অনেক ঘটনাই ঘটে। এর মধ্যে অনৈতিক ঘটনার খবর নানা সময় মিডিয়াকে তোলপাড় করেছে। ‘নারীরা সব ক্ষেত্রে অনিরাপদ’, বর্তমান সময়ের উন্মুক্ত বিশ্বায়নের যুগে এসেও শুনতে হয় নারীদের ওপর হেনস্তার খবর। চাকরি, পড়াশোনা, মিডিয়া- যেখানেই হোক মেয়েদের ওপর যৌন হেনস্তা যেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর ধরে বিশ্ব চলচ্চিত্রপাড়ায় যৌন হেনস্তার বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন অভিনেত্রীরা। এক্ষেত্রে নতুন একটি শব্দ খুঁজে পাওয়া গেছে। আর তা হলো ‘কাস্টিং কাউচ’। কাউকে অভিনয়ে কাস্ট করতে গেলেই নির্মাতা বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা তাদের অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে বসেন। অনেকেই এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে এই রঙিন জগতে পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেয়েছেন, অনেকে আবার সর্বস্ব হারিয়ে পথে নেমেছেন। কেউবা আবার রাজি না হওয়ায় রুপালি ভুবন থেকে ছিটকে পড়েছেন। বছরদুয়েক আগে বলিউড অভিনেত্রী আমেরিকা প্রবাসী তনুশ্রী দত্ত দীর্ঘদিন পর ভারতে ফিরে প্রথম এ বিষয়ে ‘বোমা ফাটান’। বলিউড অভিনেতা নানা পাটেকারের দিকে আঙ্গুল তুলে তিনি অভিযোগ করেন তার সঙ্গে অভিনয়ের সময় তিনি তাকে কুপ্রস্তাব দেন।

বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এরপর নারীরা যেন সাহসী হয়ে ওঠলেন। একের পর এক বেরিয়ে আসতে থাকে কুকর্মের থলের বিড়াল। একাধারে মুখ খুলতে থাকেন বলিউড-হলিউড অভিনেত্রীরা। বাংলাদেশের কয়েকজন অভিনেত্রীও এমন সাহস দেখান। বলিউডে শুধু অভিনেত্রীরা নন, অভিনেতারাও কাস্টিং কাউচের শিকার হন। ‘কাস্টিং কাউচ’ যেন বলিউড ইন্ডাস্ট্রির রিয়ালিটি। বলিউডে রণবীর সিং এখন পরিচিত নাম। জনপ্রিয়তার নিরিখেও তিনি প্রথম সারিতেই রয়েছেন। তিনিও নাকি ‘কাস্টিং কাউচ’-এর কবলে পড়েন। কীভাবে? ভারতীয় গণমাধ্যমে তিনি বলেছিলেন, ‘এক ভদ্রলোক তার আন্ধেরির বাড়িতে আমাকে একবার ডেকেছিলেন। আমি খুব সুন্দর পোর্টফোলিও তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি তা দেখলেনই না। বরং বলেছিলেন, তোমাকে আরও স্মার্ট হতে হবে। আরও সেক্সি হতে হবে। তারপর আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে বলেছিলেন, আমরা কিছুই করব না। আমাকে একবার ছুঁতে দাও’। পরে রণবীর জানতে পারেন এমন ব্যবহার তিনি অনেকের সঙ্গেই করে থাকেন। বলিউডে স্বতন্ত্র একটি অবস্থান গড়ে নিয়েছেন আয়ুষ্মান খুরানা। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি প্রথমে টেলিভিশনে অ্যাঙ্কারিং করতাম। এক কাস্টিং ডিরেক্টর আমাকে সরাসরি যৌন প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, আমি স্ট্রেট। না হলে আপনার প্রস্তাব ভেবে দেখতাম।’ কাল্কি কোয়েচলিন, দীপিকা পাড়–কোন, কঙ্গনা রানাউত, মমতা কুলকার্নিসহ অনেকেই মুখ খুলেছেন এ বিষয়ে। হলিউডে তো গত বছর তুলকালাম হয়ে গেছে।

হলিউড প্রযোজক হার্ভে ওয়েনস্টেনের যৌন কেলেঙ্কারির পর ফের যৌন হেনস্তার অভিযোগে তোলপাড় হয়েছে হলিউড। পরিচালক, লেখক অ্যান্ড্রু ক্রেসবার্গের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। যৌন হেনস্তার প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গবঞড়ড় ক্যাম্পেন সাড়া ফেলেছিল গোটা বিশ্বে। কীভাবে কাস্টিং কাউচের শিকার হতে হয়েছিল তাও বর্ণনা করেছেন অনেক অভিনেত্রী। এ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন বলিউডের বর্ষীয়ান প্রযোজক মুকেশ ভাট। কাস্টিং কাউচ ইস্যুতে ‘বিশ্বাস ফিল্মস’-এর এই কর্ণধার বলেন, বলিউডে নিয়মিত এ ধরনের ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষদের বিরুদ্ধেই এমন অভিযোগ ওঠে। পুরুষরা এসব করেও থাকে। তবে সব ক্ষেত্রে কেবল পুরুষদের দোষ দিলে চলে না। ভালো-খারাপ সব ক্ষেত্রেই রয়েছে। এখন যুগ বদলেছে। এমন অনেক মেয়ে রয়েছে, যারা স্বেচ্ছায় প্রস্তাব দেয়। ‘অভিনেত্রী হতে চাইলে যৌন সম্পর্ক করতে হবে’ এমন কথা বলা হয়েছে বলিউড অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তেকে। শুধু প্রস্তাব দিয়েই এক নির্মাতা ক্ষান্ত হননি। রাধিকার কথায়, ‘সে ব্যক্তি যেখানে চেয়েছে আমার শরীরের সেখানেই হাত দিয়েছে। সে যেখানেই চেয়েছে আমার শরীরের সেখানেই চুমু খেয়েছে। সে আমার জামার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তাকে থামিয়ে দিয়েছিলাম। তখন সে বলল, তোমার মনোভাব যদি এ রকম হয় তাহলে তুমি এখানকার জন্য উপযুক্ত নয়।’ রাধিকা আপ্তে মনে করেন, হলিউডে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সেখানকার নারী-পুরুষ সবাই যেভাবে একত্রিত হয়েছে তা বলিউডেও দরকার। বলিউডের সুপরিচিত অভিনেতা ফারহান খান বলেন, ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা। আশা করি এটার পরিবর্তন হবে। কাস্টিং কাউচ নিয়ে সরব হন বলিউড অভিনেত্রী জেরিন খান। এই অভিনেত্রী জানান, তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। একটি সিনেমার শুটিংয়ের আগে চুম্বন দৃশ্যের রিহার্সেল করতে বলা হয়। একবার নয়, বারবার রিহার্সেল করতে বলা হয়। এখানেই শেষ নয়, ওই সিনেমার পরিচালকের সঙ্গেও নাকি চুম্বন দৃশ্যের অনুশীলন করতে বলা হয়েছিল। তবে সেই প্রস্তাবে একদমই সাড়া দেননি জেরিন খান। তিনি শুধু পরিচালকই নন, কারও সঙ্গেই শুটিংয়ের আগে চুম্বনের রিহার্সেল করবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন। এর আগে বলিউডের গুণী অভিনেত্রী বিদ্যাবালানও কাস্টিং কাউচ নিয়ে মুখ খুলেছিলেন। তিনি জানান, চেন্নাইতে এক পরিচালক তাকে নিজের ঘরে নিয়ে যেতে চান বলে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ ছাড়া রিচা চাড্ডা, স্বরা ভাস্কর-রাও এ বিষয়ে জানিয়েছেন তাদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতার কথা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে কাস্টিং কাউচের শিকার হতে হয়েছিল বলে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ভারতের জনপ্রিয় টেলিভিশন অভিনেত্রী রেশমী দেশাই। ভারতের এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দুঃসহ সেই ঘটনা সম্পর্কে রেশমী বলেন, ‘প্রায় ১৩ বছর আগে বেশ অল্প বয়সেই মিডিয়ায় কাজ শুরু করি। ওই সময় সুরজ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। প্রথম মিটিংয়েই সে আমার ‘স্ট্যাটিসটিক্স’ জানতে চায়। ওকে বললাম আপনি ঠিক কী জানতে চাইছেন, আমি বুঝতে পারছি না। তখনই ও আমায় যৌন হেনস্তা করার চেষ্টা করে।’ শুটিংয়ে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে কিছু অভিনেতা অসভ্যতা করেন, অভিযোগ তুলেছেন আরও পাঁচ নায়িকা। তাদের কথায় বলিউডে কাস্টিং কাউচের শিকার হননি এরকম তারকা খুব কমই আছেন। তবে এবার অন্য এক সমস্যা নিয়ে মুখ খুললেন বলিউডের বিখ্যাত পাঁচ নায়িকা। মূলত শুটিংয়ের ঘনিষ্ঠ দৃশ্যগুলোতে কিছু কিছু অভিনেতা সেই মুহূর্তের সুযোগ নেন বলে জানিয়েছেন এই নায়িকারা। তাদের মধ্যে রয়েছেন- বীণা মালিক, তনুশ্রী দত্ত, রিচা চাড্ডা প্রমুখ। অভিনয়ের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি নিয়ে সিনিয়র অভিনেত্রীরাও মুখ খুলেছেন। তিনি বলেন, যৌন নিপীড়ন আমাকে কাঁদিয়েছিল। জীবনের প্রথম চলচ্চিত্র ‘আনজানা সফর’-এ অভিনয় করতে গিয়ে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলাম। রেখার বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। ডাক পেলেন ‘আনজানা সফর’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করার। আর এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই রুপালি পর্দায় তার অভিষেক হয়। সেদিক থেকে এটি রেখার জীবনের স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি হতে পারত। তবে সেটি আর হয়নি। পারলে রেখা এই ছবিটির কথা ভুলে যেতেন। কারণ, রুপালি পর্দায় অভিষেকের আনন্দকে ছাপিয়ে এই ছবি তাকে যৌন নিপীড়নের গভীর কষ্ট দিয়েছিল। পরিচালক ‘অ্যাকশন’ বলার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো শুটিং। কিন্তু পরিচালক যেভাবে দৃশ্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, সেভাবে কিছু হচ্ছিল না। বরং নায়ক বিশ্বজিৎ রেখাকে নিজের বাহুতে জোরে আটকে ধরে চুমু দিতে শুরু করেন। চিত্রনাট্যের বাইরে গিয়ে নায়কের এমন আচরণে রেখা হতবাক হয়ে যান। কিন্তু তার কিছুই করার ছিল না। নায়ক তাকে ছাড়ছেন না, পরিচালকও ‘কাট’ বলছেন না। এভাবে পাঁচ মিনিট পার হয়। কিন্তু বিশ্বজিৎ আর রেখার ঠোঁট ছাড়েননি। বহুকাল এই ঘটনা রেখাকে প্রচ- কষ্ট দিয়েছে। এ নিয়ে কথা উঠলে বিশ্বজিৎ বলেছিলেন, এটা পরিচালকের মাথা থেকে এসেছিল। তিনি শুধু পরিচালকের হুকুম তামিল করেছেন। রেখার জীবনে যা ঘটেছিল তা ৪৪ বছর আগের চলচ্চিত্র ‘লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস’-এর নায়িকা মারিয়া স্নাইদারের জীবনের ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয়। ১৯ বছর বয়সী মারিয়াকে অন্ধকারে রেখে পরিচালক বের্নার্দো বেরতোলুসি ও নায়ক মার্লোন ব্র্যান্ডো জোর করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের দৃশ্য সংযোজন করেন। ওই দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে নিজেকে ধর্ষিতা মনে করেছিলেন বলে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন মারিয়া। তার ভাষায়, ‘সত্যি বলতে, আমার মনে হচ্ছিল, আমি ধর্ষণের শিকার হয়েছি; নায়ক ও পরিচালকের দ্বারা।’

অভিনেত্রী মমতা কুলকার্নি যখন ‘চায়না গেট’ ছবির শুটিং করছিলেন, তখন পরিচালক রাজকুমার সন্তোষী তার সঙ্গে যৌন মিলনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে তাতে সায় দেননি মমতা। বিখ্যাত পরিচালক দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ এনেছিলেন পায়েল রোহাতগি। তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি যখন দিবাকরের সাংহাই ছবির জন্য অডিশন দেন, তখন এক দিন দিবাকর নাকি তার বাড়ি এসে পায়েলকে তার টপ খুলতে বলেন। তিনি রাজি না হওয়ায়, ছবি থেকে বাদ পড়েন। অভিনেত্রী চিত্রাঙ্গদা সিংহের সঙ্গে খারাপ ঘটনা ঘটেছিল ‘বাবুমশাই বন্দুকবাজ’ ছবিটি শুট করার সময়। ছবিটি মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছিলেন চিত্রাঙ্গদা। চিত্রাঙ্গদা সিংহ জানিয়েছিলেন, পরিচালক একটি ঘনিষ্ঠ দৃশ্য শুট করার সময় তাকে নাকি বলেন, ‘টাঙ্গে রাগদো অ্যান্ড সেক্স কর!… এ কথায়ই আপত্তি ছিল চিত্রাঙ্গদার।

কাস্টিং কাউচ নিয়ে মুখ খোলেন বলিউড তারকা সানি লিওন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ‘কাস্টিং কাউচ সব সময়ই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ছিল, এখনো আছে। কাস্টিং কাউচকে যদি আমরা অস্বীকার করি, আমরা এগোতে পারব না। পিছিয়ে পড়ব। আমার নিজের জীবনই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।’ সানির ভাষ্য, ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই যত বেশি পেশাদার হবেন তত কাস্টিং কাউচের সমস্যা দূর হয়ে যাবে। এক পরিচালকের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ আনেন অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাউত। প্রিয়াঙ্কা চোপড়াও অভিযোগ করা থেকে পিছিয়ে থাকেননি। সর্বশেষ অভিনেত্রী শিল্পা শেঠি অভিযোগ তোলেন অভিনেতা অক্ষয় কুমারের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, অক্ষয় আমাকে ব্যবহার করেছেন। একটি সংবাদমাধ্যমে শিল্পা শেঠি বলেছেন, অক্ষয় কুমার যে আসলে তার হৃদয়ের সঙ্গে খেলা করেছেন সে বিষয়টি মেনে নিতেই তার খুব কষ্ট হয়েছিল। তিনি বলেন, অক্ষয় কুমার আমায় ইচ্ছা করে ব্যবহার করেছেন এবং সময়মতো অন্য আর একজনকে পেয়ে যাওয়ার পর আমায় ছেড়ে দিয়েছেন। অতীত সহজে ভোলা যায় না। আমি ওর সঙ্গে আর ভবিষ্যতে কোনো দিন কাজ করব না।

Check Also

কিসের টানে অভিনয় ছাড়লেন কুসুম

নাটক এবং চলচ্চিত্র নিয়েই ছিল অভিনেত্রী কুসুম শিকদারের ব্যস্ততা। হঠাৎ করেই সেই ব্যস্ততা থেকে দূরে …